বলিউডের পর্দার সুপারহিরো 'ক্রিশ'কে চেনেন অনেকেই। হৃতিক রোশনের এই চরিত্রের কালো পোশাক আর শূন্যে ভেসে বেড়ানোর স্টান্ট দেখে মুগ্ধ হননি, এমন দর্শক খুব কমই আছেন। এবার সেই ক্রিশেরই দেখা মিলল বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একের পর এক ভিডিওতে এক তরুণকে দেখা যাচ্ছে ক্রিশের মতো কালো পোশাক পরে শরীরী কসরত করতে। তাঁর নাম মামুন। পেশায় তিনি এসএস পাইপ মিস্ত্রি। আর স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন পরিচিত 'বাংলার ক্রিশ' নামে।
দিনের আলোয় মামুন একজন সাধারণ পাইপ মিস্ত্রি। স্টিল আর লোহার ভারী কাজ করেই চলে তাঁর জীবিকা। কিন্তু কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি ডুবে থাকেন সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে। ছোটবেলা থেকেই শরীরচর্চা, ডিগবাজি আর নানা ধরনের কসরতের প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকেই প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর ধরে নিয়মিত অনুশীলন করে আসছেন তিনি। কখনো ফাঁকা মাঠে, কখনো ভবনের ছাদে, কখনো ব্রিজের ওপর, যেখানে সুযোগ পান সেখানেই চলে তাঁর স্টান্টের চর্চা।
শুরুতে শুধু ডিগবাজির ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে দিতেন মামুন। কিন্তু সাধারণ কসরতে তেমন নজর কাড়তে না পেরে ভাবলেন ব্যতিক্রমী কিছু করার কথা। তখনই মাথায় এলো 'ক্রিশ' চরিত্রের কথা। সমস্যা একটাই, দামি পোশাক কেনার সামর্থ্য ছিল না তাঁর। উপায় বের করলেন নিজেই। বোনের একটি পুরোনো বোরকা কেটে নিজের কল্পনা আর হাতের কাজে বানিয়ে ফেললেন ক্রিশের মতো কালো পোশাক, সঙ্গে ফেস মাস্কও। এভাবেই জন্ম নিল 'বাংলার ক্রিশ'-এর চেহারা।
সেই পোশাক গায়ে চাপিয়ে স্টান্টের ভিডিও বানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছাড়তে থাকেন মামুন। ফেসবুক আর টিকটকে ছড়িয়ে পড়ে সেগুলো, মুহূর্তেই ভাইরাল। তাঁর কসরত দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভিড় জমান উৎসুক মানুষ, মুঠোফোনে ধারণ করেন সেই দৃশ্য। প্রতিক্রিয়া অবশ্য মিশ্র। একদল প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন তাঁর ইচ্ছাশক্তি আর কায়িক দক্ষতার, অন্যদিকে কেউ কেউ করছেন কটাক্ষও। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ১৪ অক্টোবর দুটি নিউজ পোর্টাল প্রকাশ করে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন।
মামুনের স্বপ্ন শুধু ক্রিশের পোশাক পরে ভাইরাল হওয়া নয়। তিনি চান এই প্রতিভাকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরতে। এজন্য সরকারি প্রশিক্ষণ আর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সহযোগিতা চান তিনি। তাঁর ভাষায়, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পেলে নিজের প্রতিভাকে আরও ভালোভাবে তুলে ধরতে পারবেন তিনি। একদিন চলচ্চিত্রে অ্যাকশন ও স্টান্টম্যান হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার স্বপ্নও দেখেন তিনি।
মামুনের এই স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয়রাও। দর্শক মো. ইমরান হোসেনের ভাষায়, নিজের ইচ্ছা আর পরিশ্রম দিয়ে ব্যতিক্রম কিছু করার চেষ্টা করছেন মামুন। প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহযোগিতার সুযোগ পেলে আরও ভালো কিছু করতে পারবেন তিনি। মামুনের সহযোগী আরিফ হোসেনের প্রত্যাশা, ভালো প্রশিক্ষণ আর নিরাপদ সরঞ্জাম পেলে এই প্রচেষ্টা আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কিংবা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই এক যুবকের বছরের পর বছর একক প্রচেষ্টার গল্প এটি। তবে এখানে একটা প্রশ্নও থেকে যায়। পেশাদার তত্ত্বাবধান ছাড়া উঁচু জায়গা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট কতটা নিরাপদ? স্থানীয়রাই বলছেন, মামুনের দরকার নিরাপদ সরঞ্জাম আর সঠিক প্রশিক্ষণ। সেই সহযোগিতা মিললে সিরাজগঞ্জের এই পাইপ মিস্ত্রি হয়তো একদিন দেশের চলচ্চিত্রে অ্যাকশন ধারায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবেন।
একটা কথা স্পষ্ট করে রাখা দরকার। 'বাংলার ক্রিশ' নিয়ে এখনো দেশের প্রথম সারির বড় সংবাদমাধ্যমের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আসেনি। এ পর্যন্ত কভারেজ এসেছে আঞ্চলিক ও ছোট আকারের কয়েকটি নিউজ পোর্টাল থেকে। ফলে মামুনকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া নানা দাবির সবটাই যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে যেটুকু যাচাই করা গেছে, সেটাই এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।
