বিনোদন ঝলক
তারকা

জন্মশতবর্ষে চাক বেরি: বিটলস থেকে অঞ্জন দত্ত, যাঁর গিটারে বদলে গেল সংগীতের ধারা

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৮ অক্টোবর ২০২৬5 মিনিটে পড়ুন
জন্মশতবর্ষে চাক বেরি: বিটলস থেকে অঞ্জন দত্ত, যাঁর গিটারে বদলে গেল সংগীতের ধারা

আজ ১৮ অক্টোবর। ঠিক এক শ বছর আগে এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইসে জন্ম নিয়েছিলেন এক শিল্পী, যিনি বদলে দিয়েছিলেন জনপ্রিয় সংগীতের গতিপথ। তাঁর নাম চার্লস এডওয়ার্ড অ্যান্ডারসন বেরি, সারা পৃথিবী যাঁকে চেনে চাক বেরি নামে। গায়ক, গীতিকার ও গিটারবাদক, তিন পরিচয়েই তিনি স্মরণীয়। আর এই তিনের সমন্বয়েই তিনি হয়ে উঠেছিলেন রক অ্যান্ড রোলের অন্যতম পথিকৃৎ। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে আজ তুলে ধরা হয়েছে এই কিংবদন্তির জীবন ও প্রভাবের গল্প।

গিটারের প্রেমে পড়ার শুরুটা অনেকেরই একটি গান শুনেই হয়। চাক বেরির 'জনি বি. গুড' তেমনই এক গান। গানটির শুরুর বাজনা শুনে গিটারপ্রেমীর মনে হতেই পারে, এমন করে যদি বাজাতে পারতাম! তারপর গান যত এগোয়, সেই ইচ্ছার সঙ্গে মিশে যায় এক তরুণের গল্প। সেই স্বপ্নই শুনিয়েছিলেন চাক বেরি। তাঁর জন্মের এক শ বছর পরও গানটি পৃথিবীর কোনো প্রান্তে নতুন কারও হাতে গিটার তুলে নেওয়ার প্রেরণা হয়ে উঠতে পারে। গানটির যাত্রা পৃথিবীতেও থামেনি। ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপিত ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২ মহাকাশযানের গোল্ডেন রেকর্ডে জায়গা পেয়েছে 'জনি বি. গুড'। পৃথিবীর সংগীতের নমুনা হিসেবে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে চাক বেরির গানও।

রক অ্যান্ড রোল ছিল অনেক শিল্পী ও সংগীতধারার মিলিত ফসল। চাক বেরি সেই ধারাকে দিয়েছিলেন স্বতন্ত্র ভাষা। ব্লুজ, রিদম অ্যান্ড ব্লুজ ও কান্ট্রির উপাদান মিলিয়ে গড়ে তুলেছিলেন নিজের বাজনা। গিটারের ঝলক, ছন্দের দোলা আর ছোট ছোট গল্পে ভরা গানের কথা, সব মিলিয়ে তাঁর গান সহজেই চেনা যেত। পরের প্রজন্মের বহু রকশিল্পীর কাছে সেই ধরন হয়ে ওঠে অনুসরণযোগ্য। সেন্ট লুইসের ক্লাবগুলো ছিল তাঁর সংগীতচর্চার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ১৯৫৩ সালে তিনি যোগ দেন পিয়ানোবাদক জনি জনসনের দল স্যার জনস ট্রিওতে। শ্রোতাদের সামনে বাজাতে বাজাতে তিনি বুঝেছিলেন, কোন সুরে তাঁদের পা নড়ে, কোন পরিবেশনা মনোযোগ ধরে রাখে।

বড় সুযোগটি আসে ১৯৫৫ সালে। শিকাগোয় মাডি ওয়াটার্সের সঙ্গে দেখা করে তিনি জানতে চান, রেকর্ড করতে হলে কার কাছে যাবেন। ওয়াটার্স তাঁকে চেস রেকর্ডসের লিওনার্ড চেসের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে আসে 'মেবেলিন'। গানটি যুক্তরাষ্ট্রের রিদম অ্যান্ড ব্লুজ তালিকার শীর্ষে ওঠে, পপ তালিকায় পৌঁছায় পঞ্চম স্থানে। ক্লাবের গণ্ডি পেরিয়ে চাক বেরি পৌঁছে যান বৃহত্তর শ্রোতাদের কাছে। এরপর একের পর এক গান। ১৯৫৬ সালে 'রোল ওভার বিটোফেন'। পরের বছর 'স্কুল ডেজ' ও 'রক অ্যান্ড রোল মিউজিক'। ১৯৫৮ সালে 'সুইট লিটল সিক্সটিন' ও 'জনি বি. গুড'। এসব গানে স্কুল আছে, প্রেম আছে, নাচের আনন্দ আছে।

বেরির গান যেমন শোনার, তাঁর পরিবেশনা তেমনি দেখারও। গিটার বাজাতে বাজাতে হাঁটু ভাঁজ করে নিচু হয়ে মঞ্চে এগিয়ে যেতেন। বিখ্যাত সেই 'ডাক ওয়াক' হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়ের অংশ। মুখভঙ্গি, চলাফেরা আর বাজনা মিলিয়ে দর্শককে মাতিয়ে রাখতেন। গিটার হাতে মঞ্চের সামনে দাঁড়ানো শিল্পীর যে ছবি রকসংগীতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, তা গড়ে তোলায় বেরির বড় ভূমিকা ছিল। বর্ণবিভক্ত মার্কিন সমাজে তাঁর সংগীতের আরেকটি তাৎপর্যও ছিল। কৃষ্ণাঙ্গ সংগীতের ঐতিহ্য থেকে উঠে আসা একজন শিল্পীর গান আপন করে নিচ্ছিল শ্বেতাঙ্গ তরুণেরাও। সংগীতের নানা ধারার সঙ্গে শ্রোতাদের মধ্যকার দূরত্বও কিছুটা ঘুচছিল।

বেরির প্রভাব আটলান্টিক পেরিয়ে পৌঁছায় ব্রিটেনে। বিটলস ও রোলিং স্টোনস তাঁর গান গেয়েছে। তাঁর বাজনা অনুপ্রাণিত করেছে জিমি হেনড্রিক্সসহ পরের প্রজন্মের বহু শিল্পীকে। জন লেনন একবার বলেছিলেন, রক অ্যান্ড রোলকে অন্য কোনো নাম দিতে চাইলে, তাকে চাক বেরি বলা যায়। উপমহাদেশেও তাঁর গান পৌঁছেছে নানা পথে। কেউ শুনেছেন বেরির নিজের রেকর্ড। কেউ তাঁর পরিচয় পেয়েছেন বিটলস বা রোলিং স্টোনসের গান শুনতে গিয়ে। অঞ্জন দত্তের অনুপ্রেরণার তালিকাতেও চাক বেরির নাম রয়েছে। ২০১০ সালে 'দ্য টেলিগ্রাফ'এর এক প্রতিবেদনে এই তথ্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের সঙ্গে যোগসূত্রটি খুঁজতে হয় ব্যান্ডসংগীতের শুরুর দিকে। সোলসের ৫০ বছর নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারে আসরার চৌধুরীর এক নিবন্ধে সেই ইতিহাসের আলোচনা রয়েছে। চাক বেরিসহ মার্কিন শিল্পীদের গড়ে তোলা রক অ্যান্ড রোলকে পরে ব্রিটিশ শিল্পীরা এগিয়ে নেন। তাঁদের গান দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের কাছে পৌঁছানোর একটি মাধ্যম ছিল রেডিও সিলোনের 'প্যারাডাইস আইল্যান্ড' অনুষ্ঠান। পাশ্চাত্য গান শোনার এই অভ্যাসকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যান্ডসংগীত গড়ে ওঠার পটভূমির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। আবার চাক বেরির সঙ্গে আজম খানের তুলনাও করেছেন কেউ কেউ। আসরার চৌধুরী লিখেছিলেন, বেরির মতো আজম খানও তরুণদের আপন গান উপহার দিয়েছেন। গানে স্মরণীয় করেছেন দেশের মানুষ ও জায়গার নাম। এই তুলনা অবশ্য আজম খানের ওপর বেরির সরাসরি প্রভাবের প্রমাণ নয়। মিলটি তাঁদের ভূমিকায়। দুই ভিন্ন সমাজে তাঁরা তরুণদের অনুভূতি প্রকাশের নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন।

বেরির জীবন সাফল্যের সরল গল্প নয়। কারাবাস ও আইনি জটিলতা তাঁর সংগীত জীবনে ছেদ ফেলেছে। জনপ্রিয়তায়ও ওঠানামা ছিল। তবে তাঁর গান পরের প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে বেঁচে থেকেছে। একটি মজার তথ্য আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পপ সিঙ্গেলস তালিকায় তাঁর একমাত্র শীর্ষস্থান পাওয়া গান 'মাই ডিং-আ-লিং', ১৯৭২ সালে। 'জনি বি. গুড' বা 'রোল ওভার বিটোফেন' সেই জায়গায় পৌঁছায়নি। অথচ রকসংগীতে তাঁর অবদানের কথা বলতে গেলে এই গানগুলোর নামই সামনে আসে। তালিকার অবস্থান দিয়ে একটি গানের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সব সময় বোঝা যায় না। স্বীকৃতি পেয়েছেন প্রচুর। ১৯৮৪ সালে রেকর্ডিং একাডেমি তাঁকে আজীবন সম্মাননার গ্র্যামি দেয়। ১৯৮৬ সালে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমের প্রথম অন্তর্ভুক্ত শিল্পীদের একজন হন তিনি। তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন রোলিং স্টোনসের গিটারবাদক কিথ রিচার্ডস। যাঁর সংগীতে অনুপ্রাণিত হয়ে পরের প্রজন্ম এগিয়েছে, তাঁকে স্বীকৃতি জানানোর মঞ্চেও ছিল সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি।

২০১৭ সালের ১৮ মার্চ মিজৌরির সেন্ট চার্লস কাউন্টিতে নিজ বাড়িতে মারা যান চাক বেরি। বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। সে বছরের ৯ জুন প্রকাশিত হয় তাঁর শেষ স্টুডিও অ্যালবাম 'চাক'। আগের স্টুডিও অ্যালবামের ৩৮ বছর পর নতুন অ্যালবাম নিয়ে শ্রোতাদের কাছে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই অ্যালবামের প্রকাশ দেখে যেতে পারেননি। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষে সারা পৃথিবীর সংগীতপ্রেমীরা স্মরণ করছেন সেই শিল্পীকে, যাঁর গিটারের ঝলক আজও তরুণদের গান শেখার প্রথম পাঠ।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার