বিনোদন ঝলক
ভ্রমণ

হিমছড়ি ভ্রমণ গাইড ২০২৬: ঝরনা, পাহাড় আর সাগরের মায়াবী মিলন

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৭ অক্টোবর ২০২৬8 মিনিটে পড়ুন
হিমছড়ি ভ্রমণ গাইড ২০২৬: ঝরনা, পাহাড় আর সাগরের মায়াবী মিলন

ভূমিকা কক্সবাজার গিয়ে শুধু সৈকত দেখে ফিরে এলে অনেক কিছুই মিস হয়ে যায়। শহর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে মেরিন ড্রাইভ ধরে এগোলেই চোখে পড়ে পাহাড় আর সাগরের এক অপূর্ব মিলন, যার নাম হিমছড়ি। একদিকে সবুজ পাহাড়ের সারি, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, আর মাঝে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনা। হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজার ভ্রমণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অর্ধেক দিন সময় হাতে থাকলেই হিমছড়ি ঘুরে আসা যায়। এই গাইডে রইল যাতায়াত, খরচ, সেরা সময় আর জরুরি টিপস।

কেন যাবেন হিমছড়ি যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ এক ফ্রেমে পাহাড়, ঝরনা আর সমুদ্র দেখা। কক্সবাজারের সৈকত তো সবাই দেখে, কিন্তু ২৮০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দিগন্তজোড়া সাগর দেখার অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। যাওয়ার পুরো পথটাই একটা ভ্রমণ, মেরিন ড্রাইভের এক পাশে সুউচ্চ পাহাড় আর অন্য পাশে সাগরের ঢেউ, গাড়িতে বসেই এই দৃশ্য মুগ্ধ করে। বর্ষাকালে ঝরনার পূর্ণ যৌবন দেখতে, আর শীতকালে পাহাড় চূড়া থেকে সূর্যাস্ত দেখতে প্রচুর পর্যটক এখানে আসেন। ফটোগ্রাফারদের জন্য হিমছড়ি দারুণ লোকেশন, আর যারা হালকা ট্রেকিং পছন্দ করেন, তাদের জন্য পাহাড়ি সিঁড়ি বেয়ে ওঠা আনন্দদায়ক চ্যালেঞ্জ।

কী কী দেখবেন হিমছড়ির প্রধান আকর্ষণ পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রাকৃতিক ঝরনা। ছোট বড় কয়েকটি ঝরনা আছে এখানে, বর্ষাকালে পানির ধারা সবচেয়ে তীব্র থাকে। ঝরনার শীতল পানিতে পা ভিজিয়ে বসে থাকার মজাই আলাদা। তবে শুকনো মৌসুমে ঝরনায় পানি কমে যায়, তাই ঝরনা দেখার পরিকল্পনা থাকলে বর্ষা বা বর্ষা পরবর্তী সময় বেছে নিন।

ঝরনা দেখার পর পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পালা। সুবিন্যস্ত সিঁড়ি বেয়ে কয়েকশো ধাপ পেরিয়ে প্রায় ২৮০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো যায়। ওঠার পথে পাহাড়ি বনের সবুজ আর পাখির ডাক সঙ্গী হবে। চূড়ায় দাঁড়ালে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরো বঙ্গোপসাগরের বিশাল ক্যানভাস, নিচে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা মেরিন ড্রাইভ আর দূরে কক্সবাজার সৈকতের রেখা। বিকেলের দিকে গিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকলে সাগরের বুকে সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়, যা অনেকের কাছেই হিমছড়ি ভ্রমণের সেরা মুহূর্ত।

হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানের বনভূমিতে নানা প্রজাতির পাখি দেখা যায়, ভাগ্য ভালো থাকলে বন্যপ্রাণীর দেখাও মিলতে পারে। উদ্যান এলাকায় হাঁটার জন্য বনপথ আছে। হিমছড়ির কাছেই মিনি বান্দরবান নামে পরিচিত একটি পাহাড়ি সড়ক আছে, যেখান থেকে বান্দরবানের মতো পাহাড়ি দৃশ্য দেখা যায়।

কীভাবে যাবেন হিমছড়ি যেতে হলে প্রথমে কক্সবাজার পৌঁছাতে হবে। ঢাকা থেকে বাসে কক্সবাজার যাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয়, সায়েদাবাদ বা গুলিস্তান থেকে নিয়মিত বাস ছাড়ে। নন-এসি বাসের ভাড়া প্রায় ৯০০ টাকা, এসি বাসে প্রায় ১৫০০ টাকা, আর স্লিপার কোচে প্রায় ২৫০০ টাকা।

ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকার কমলাপুর থেকে সরাসরি কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন আছে। বাজেট বেশি থাকলে ঢাকা থেকে বিমানে কক্সবাজার যাওয়া যায়, সময় বাঁচে অনেক।

কক্সবাজার শহর থেকে হিমছড়ি মাত্র ১২ কিলোমিটার, মেরিন ড্রাইভ ধরে যেতে সময় লাগে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট। কলাতলী সৈকত বা সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে খোলা জিপ, সিএনজি অটোরিকশা বা ইজিবাইকে হিমছড়ি যাওয়া যায়। খোলা জিপে জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ৭০ থেকে ১০০ টাকা, আর রিজার্ভ নিলে প্রায় ১২০০ থেকে ১৬০০ টাকা। সিএনজি রিজার্ভ করে গেলে খরচ পড়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। দল বড় হলে খোলা জিপ রিজার্ভ করা সুবিধাজনক।

খরচের ধারণা হিমছড়ি সাধারণত কক্সবাজার ভ্রমণের অংশ হিসেবে ঘোরা হয়, তাই আলাদা বড় খরচ হয় না। জাতীয় উদ্যানে প্রবেশের টিকিট জনপ্রতি প্রায় ২০ থেকে ৪০ টাকা। কক্সবাজার থেকে যাতায়াতে সিএনজি রিজার্ভে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, আর খোলা জিপে জনপ্রতি প্রায় ৭০ থেকে ১০০ টাকা খরচ হয়। খাওয়ার জন্য কক্সবাজারে ফিরে খেলে দিনে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা লাগতে পারে। সব মিলিয়ে কক্সবাজার থেকে হিমছড়ি ডে-ট্রিপে জনপ্রতি খরচ পড়তে পারে প্রায় ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এগুলো আনুমানিক হিসাব, মৌসুমভেদে দাম বদলাতে পারে, তাই ভ্রমণের আগে যাচাই করে নিন।

কোথায় থাকবেন হিমছড়িতে রাত্রিযাপনের তেমন ব্যবস্থা নেই, প্রায় সবাই কক্সবাজার শহরে থেকে দিনে ঘুরে আসেন। কক্সবাজারে সব বাজেটের হোটেল আছে, সাধারণ হোটেলে রাতপ্রতি প্রায় ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা, আর ভালো মানের হোটেল বা রিসোর্টে আরও বেশি। কলাতলী বা সুগন্ধা এলাকায় থাকলে হিমছড়ি যাওয়া সুবিধা হয়, কারণ জিপ আর সিএনজি এখান থেকেই ছাড়ে। শীত মৌসুমে ও ছুটির দিনে হোটেলের চাপ বেশি থাকে, তাই আগে থেকে বুকিং করে যাওয়া ভালো।

কী খাবেন হিমছড়িতে খাবারের বড় কোনো আয়োজন নেই, দু-একটি ছোট দোকানে হালকা খাবার আর ডাব পাওয়া যায়। তাই ভারী খাবারের জন্য কক্সবাজারে ফেরাই ভালো। কক্সবাজারের হোটেলগুলোতে সামুদ্রিক মাছ, ভর্তা-ভাজি আর ঐতিহ্যবাহী খাবার পাওয়া যায়। সৈকতের পাশের রেস্তোরাঁয় বসে সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের প্রিয়। হিমছড়ি যাওয়ার সময় সঙ্গে পানি আর হালকা শুকনো খাবার রাখুন, পাহাড়ে ওঠার সময় কাজে লাগবে।

যাওয়ার সেরা সময় ঝরনা দেখাই যদি মূল উদ্দেশ্য হয়, তাহলে হিমছড়ি যাওয়ার সেরা সময় জুন থেকে অক্টোবর, অর্থাৎ বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী সময়। এই সময় ঝরনায় পানির ধারা সবচেয়ে তীব্র ও প্রাণবন্ত থাকে। আর পাহাড়ের চূড়া থেকে সাগর ও সূর্যাস্ত উপভোগ করতে চাইলে শীতকাল, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, সেরা। এই সময় আকাশ পরিষ্কার থাকে আর আবহাওয়া মনোরম। ভিড় এড়াতে চাইলে সপ্তাহের কর্মদিবসে আর সকালের দিকে যাওয়া ভালো।

টিপস ও সতর্কতা ঝরনার কাছে পাথর খুব পিচ্ছিল হয়, বিশেষ করে বর্ষাকালে। তাই ভালো গ্রিপের জুতা পরে যান, খালি পায়ে বা স্লিপারে ঝরনার কাছে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ। পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় তাড়াহুড়ো করবেন না, সঙ্গে পানি রাখুন। জাতীয় উদ্যান সাধারণত সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে, সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করুন। উদ্যানে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলবেন না, নিজের ময়লা সঙ্গে নিয়ে আসুন। বন্যপ্রাণী দেখলে দূর থেকে দেখুন, বিরক্ত করবেন না। সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসার চেষ্টা করুন।

আশপাশে আর কী দেখবেন হিমছড়ি ঘুরতে গিয়ে একই দিনে মেরিন ড্রাইভের আরও কয়েকটি স্পট দেখে নেওয়া যায়। হিমছড়ি থেকে আরও দক্ষিণে গেলে ইনানী সৈকত, যেখানে প্রবাল পাথরের সারি আর স্বচ্ছ পানির জন্য পর্যটকদের ভিড় থাকে। আরও এগোলে পাটুয়ারটেক সৈকত, যা তুলনামূলক নির্জন। পথে রেজু খালের মোহনায় নৌকায় ঘোরার সুযোগ আছে। খোলা জিপ রিজার্ভ নিলে চালককে বলে একই ট্রিপে হিমছড়ি, ইনানী আর পাটুয়ারটেক ঘুরে আসা যায়, এতে সময় আর খরচ দুটোই বাঁচে। তবে একদিনে তিনটি স্পট ঘুরতে চাইলে সকাল সকাল রওনা দিতে হবে।

কী খাবেন: বিস্তারিত কক্সবাজারে খাবারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ সামুদ্রিক মাছ। রূপচাঁদা ফ্রাই, লইট্টা ফ্রাই, চিংড়ি ভুনা আর কোরাল মাছের নানা পদ পর্যটকদের প্রিয়। সৈকতের পাশের রেস্তোরাঁগুলোতে বসে সমুদ্র দেখতে দেখতে খাওয়ার মজাই আলাদা। সকালের নাস্তায় পরোটা, ডাল, ভাজি বা খিচুড়ি পাওয়া যায় প্রায় ৫০ থেকে ১০০ টাকায়। দুপুর বা রাতের খাবারে মাছসহ সেট মেনু পাওয়া যায় প্রায় ১৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। হিমছড়ি যাওয়ার দিন সঙ্গে পানি, ডাব আর হালকা শুকনো খাবার রাখুন, কারণ পাহাড়ে ওঠার পথে ভালো খাবারের দোকান নেই।

একদিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা হিমছড়ির জন্য একটা কার্যকর পরিকল্পনা হলো সকাল ৯টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা দেওয়া। প্রথমে ঝরনা দেখুন, তখন ভিড় কম থাকে আর আলো ভালো পাওয়া যায়। এরপর পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে চূড়ায় উঠুন, ওঠা-নামায় প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগতে পারে। দুপুরে কক্সবাজারে ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে বিকেলে আবার মেরিন ড্রাইভ ধরে ইনানী বা পাটুয়ারটেক ঘুরে আসুন। সূর্যাস্তের আগে হিমছড়ির পাহাড় চূড়ায় ফিরে এলে সাগরে সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখা যাবে। সন্ধ্যার আগেই কক্সবাজারে ফেরার পরিকল্পনা রাখুন।

প্রশ্ন: হিমছড়ি ঘুরতে কত সময় লাগে? উত্তর: কক্সবাজার থেকে যাওয়া-আসা মিলিয়ে অর্ধেক দিন, অর্থাৎ প্রায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময়ই যথেষ্ট। ঝরনা, পাহাড় চূড়া আর সূর্যাস্ত দেখে ফিরে আসা যায়।

প্রশ্ন: শুকনো মৌসুমে কি হিমছড়ির ঝরনায় পানি থাকে? উত্তর: শীতকালে ঝরনায় পানি অনেক কমে যায়, কখনো কখনো প্রায় শুকিয়ে যায়। ঝরনার পূর্ণ রূপ দেখতে চাইলে বর্ষা বা বর্ষা পরবর্তী সময়ে যান।

প্রশ্ন: হিমছড়িতে কি গাইড লাগে? উত্তর: সাধারণত গাইড লাগে না, পথ স্পষ্ট আর সিঁড়ি করা আছে। তবে জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ঘুরতে চাইলে স্থানীয় কারো সাহায্য নেওয়া ভালো।

প্রশ্ন: বয়স্ক বা শিশুদের নিয়ে কি হিমছড়ি যাওয়া যায়? উত্তর: ঝরনা পর্যন্ত যাওয়া সবার জন্য সহজ। তবে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার সিঁড়ি বেশ খাড়া, তাই বয়স্ক বা ছোট শিশুদের নিয়ে চূড়ায় ওঠার পরিকল্পনা সাবধানে করুন।

প্রশ্ন: বর্ষাকালে হিমছড়ির পাহাড়ি পথ কি বিপজ্জনক? উত্তর: বর্ষায় পাথর পিচ্ছিল থাকে আর সিঁড়ি ভেজা থাকে, তাই সাবধানে চলতে হয়। ভালো গ্রিপের জুতা পরলে আর তাড়াহুড়ো না করলে সমস্যা হয় না। ভারী বৃষ্টির দিনে পাহাড়ে ওঠা এড়িয়ে চলাই ভালো।

প্রশ্ন: হিমছড়িতে ড্রোন ওড়ানো যায় কি? উত্তর: জাতীয় উদ্যান এলাকায় ড্রোন ওড়ানোর আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া ভালো। অনুমতি ছাড়া ড্রোন ওড়ালে জরিমানা বা ড্রোন জব্দ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার