চ্যানেল আইয়ের শোকবইয়ে লিখতে গিয়ে শোক প্রকাশ করতে পারেননি সংগীতশিল্পী কনকচাঁপা। শোকের বদলে তার মনে জেগেছিল গর্ব। কারণ, আইয়ুব বাচ্চুর গান মানুষের হৃদয়ে যে জায়গা করে নিয়েছে, সেটিকে একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করেন তিনি।
বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা লিখেছেন কনকচাঁপা। পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘চ্যানেল আইয়ের শোকবইয়ে লিখতে গিয়ে আমি শোক লিখতেই পারছিলাম না। শোকের বদলে উঠে এল গর্ব! এই সুরের এবং গিটারের জাদুকর যা সৃষ্টি করেছেন, তার একটি গানও মাটিতে পড়েনি, সোজা চলে গিয়েছে মানুষের হৃদয়ের ভেতর।’
রকসংগীতে কোমল সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে কীভাবে গানকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন আইয়ুব বাচ্চু, সেই বিস্ময়ের কথাও জানিয়েছেন এই সংগীতশিল্পী। তার ভাষায়, রক গানের মধ্যে রেশমের মতো কোমল মেলোডি যুক্ত করা ছিল আইয়ুব বাচ্চুর কাছে সহজ কাজ, যা দেখে তিনি বিস্মিত হন। এমন শিল্পীকে শুধু শিল্পী নয়, সাধক বলেই মনে করেন তিনি।
পোস্টে কনকচাঁপা আরও লিখেছেন, ‘আর সাধকদের জন্য বুকের ভেতরে শোক আসে না, আসে গর্ব।’ আইয়ুব বাচ্চুকে উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ গিটারবাদকদের একজন উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, এমন শিল্পীর জন্য শোকের চেয়ে গর্বই বেশি অনুভব করেন তিনি।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্ম আইয়ুব বাচ্চুর। সংগীতজীবনের শুরুর দিকে বিভিন্ন ব্যান্ডে বাজানোর পর যুক্ত হন 'সোলস' ব্যান্ডে। এরপর ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড এলআরবি। এলআরবির সঙ্গে তার পথচলা বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
কনসার্টে আইয়ুব বাচ্চুর উপস্থিতি বরাবরই আলাদা মাত্রা যোগ করত। গাইবার পাশাপাশি তার গিটারবাদনে মুগ্ধ হননি এমন শ্রোতা পাওয়া যাবে না। তার একটি অপূর্ণ স্বপ্নও ছিল: ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ১৫ লাখ দর্শকের সামনে দেশি-বিদেশি শিল্পীদের নিয়ে বিশাল এক কনসার্ট আয়োজন করা। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
মঞ্চে গিটার হাতে দাঁড়ালে আইয়ুব বাচ্চু যেন অন্য এক মানুষ হয়ে যেতেন। কখনো গিটারের তারে ঝড় তুলতেন, কখনো দীর্ঘ একক পরিবেশনায় শ্রোতাদের নিয়ে যেতেন অন্য এক জগতে। গাইবার পাশাপাশি এই গিটারবাদনই তাকে শ্রোতাদের কাছে অনন্য করে তুলেছিল।
আইয়ুব বাচ্চু বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী নামগুলোর একটি। এলআরবির এই গায়ক ও গিটারবাদকের গান প্রজন্মের পর প্রজন্মের যুবসমাজের মুখে মুখে ফেরে। কনকচাঁপার ভাষায়, তার গান খাতায় লিখতে হয় না; এদেশের যুবসমাজ নামতার মতো মুখস্থ গাইতে পারে। এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে একজন শিল্পীর।
মৃত্যুবার্ষিকীতে সহশিল্পীদের এমন স্মৃতিচারণই প্রমাণ করে, আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন শিল্পী নন, তিনি একটি প্রজন্মের আবেগের নাম। কনকচাঁপার এই আবেগঘন পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
একই সংগীত অঙ্গনের শিল্পী হিসেবে কনকচাঁপার এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। মৃত্যুর আট বছর পরও সহশিল্পীদের স্মৃতিতে যেভাবে বেঁচে আছেন আইয়ুব বাচ্চু, তা প্রমাণ করে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বাংলা গানের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
