শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে সবুজের এক ঘন আস্তরণ, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষিত এই বনের আয়তন প্রায় ১২৫০ হেক্টর। আধা চিরসবুজ এই ক্রান্তীয় বন বাংলাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আবাস। বিপন্ন প্রজাতির উল্লুকের ডাক, হনুমানের লাফালাফি, নানা রঙের পাখি আর অর্কিডের সৌন্দর্য মিলে লাউয়াছড়া প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক জীবন্ত জাদুঘর। শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে এলে এই বনে অন্তত অর্ধেক দিন না কাটালে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কেন যাবেন
লাউয়াছড়া যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ এর বন্যপ্রাণী। বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে থাকা উল্লুকের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আবাস এই বন। ভোরে বা সকালে বনে ঢুকলে গাছের ডালে ডালে উল্লুকের লাফ আর তাদের স্বতন্ত্র ডাক শোনা যায়। এছাড়া মুখপোড়া হনুমান, বানর, বনমোরগ আর শত শত প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। যারা শহরের কোলাহল থেকে দূরে ঘন বনের নিস্তব্ধতায় হাঁটতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য লাউয়াছড়ার হাঁটা পথগুলো আদর্শ। নিসর্গ প্রকল্পের অধীনে এখানে সুশৃঙ্খল প্রকৃতি ভ্রমণের ব্যবস্থা আছে, প্রশিক্ষিত গাইড নিয়ে বনের গভীর পর্যন্ত যাওয়া যায়।
কী কী দেখবেন
তিনটি হাঁটা পথ: বনের ভেতরে তিনটি নির্দিষ্ট ট্রেইল আছে। একটি ৩০ মিনিটের, একটি ১ ঘণ্টার আর একটি ৩ ঘণ্টার পথ। সময় ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী বেছে নিন। ৩ ঘণ্টার পথে বনের গভীরে যাওয়া যায়, যেখানে বন্যপ্রাণী দেখার সম্ভাবনা বেশি।
উল্লুক ও হনুমান: ভাগ্য ভালো থাকলে গাছের উঁচু ডালে উল্লুক পরিবারের দেখা মিলবে। সকালে তাদের ডাক বহুদূর থেকে শোনা যায়। মুখপোড়া হনুমান আর বানরের দলও চোখে পড়ে। দূরবীন থাকলে দেখার অভিজ্ঞতা আরও ভালো হয়।
পাখি ও অর্কিড: লাউয়াছড়া পাখি দেখার জন্য বিখ্যাত। শীতকালে পরিযায়ী পাখির আগমনে বন আরও সরব হয়। গাছে গাছে নানা রঙের অর্কিড ফুটে থাকে, বর্ষার পর এদের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি।
খাসিয়াপুঞ্জি: উদ্যানের পাশেই মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জি। খাসিয়ারা বনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে টিলার ওপর বসবাস করেন, তাদের প্রধান পেশা পান চাষ। পুঞ্জিতে গেলে পান বরজ আর তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা দেখা যায়।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল: বাসে ফকিরাপুল, মহাখালী বা সায়েদাবাদ থেকে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। বাসভেদে জনপ্রতি ভাড়া ৪৭০ থেকে ৬০০ টাকা। ট্রেনে কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে শ্রীমঙ্গলগামী ট্রেনে ভাড়া শ্রেণীভেদে ২৪০ থেকে ৮২৮ টাকা। রাতের বাস বা সকালের ট্রেনে গেলে দিনের শুরুতেই বনে ঢোকা যায়।
শ্রীমঙ্গল থেকে লাউয়াছড়া: শ্রীমঙ্গল শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় লাউয়াছড়া যাওয়া সবচেয়ে সহজ। রিজার্ভ নিলে যাওয়া আসা ও বন ঘোরা মিলিয়ে ভাড়া পড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। দল বেঁধে গেলে ভাড়া ভাগ করে নেওয়া যায়।
বনের ভেতরে চলাচল: উদ্যানের প্রবেশমুখ থেকে গাইড নেওয়া যায়। গাইড ফি ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। গাইড ছাড়াও নির্দিষ্ট পথে নিজে হাঁটা যায়, তবে বন্যপ্রাণী খুঁজতে গাইডের সাহায্য অনেক কাজে লাগে।
খরচের ধারণা
লাউয়াছড়ায় প্রবেশমূল্য বেশ সাশ্রয়ী। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জনপ্রতি ৫০ টাকা, ছাত্র ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ২০ টাকা। বিদেশি পর্যটকদের দিতে হয় ৫০০ টাকা। নিজস্ব বা রিজার্ভ গাড়ির পার্কিং ফি ২৫ টাকা। গাইড নিলে আরও ২০০ থেকে ৬০০ টাকা যোগ হবে। শ্রীমঙ্গল থেকে দিনভ্রমণে যাতায়াত, টিকিট, গাইড ও খাবার মিলিয়ে জনপ্রতি খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা। ভ্রমণের আগে টিকিটের হার যাচাই করে নিন, কারণ হার পরিবর্তন হতে পারে।
কোথায় থাকবেন
বেশিরভাগ পর্যটক শ্রীমঙ্গল শহরে থাকেন। শহরে বাজেট হোটেল থেকে রিসোর্ট সবই আছে। চা বাগান ঘেঁষা ভানুগাছা সড়কে কটেজ, গেস্ট হাউস ও রিসোর্ট রয়েছে। বাংলো ধাঁচের কটেজে ৪ থেকে ৮ জন থাকা যায়, প্রতি রাতে ভাড়া ৫০০০ থেকে ৮০০০ টাকা। মাঝারি মানের হোটেলে ২০০০ থেকে ১০০০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া হতে পারে। লাউয়াছড়া বন রেস্ট হাউসে থাকতে চাইলে বন বিভাগের অনুমতি নিতে হয়। বনের ভেতরে রাত কাটানোর অনুমতি সাধারণ পর্যটকদের মেলে না।
কী খাবেন
বনে ঢোকার আগে শ্রীমঙ্গল শহরে সকালের নাস্তা সেরে নিন। শহরের হোটেলগুলোতে ভাত, মাছ, মুরগি, ডালের বাঙালি খাবার পাওয়া যায়, দুপুরের খাবারে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লাগে। বনের ভেতরে খাবারের দোকান নেই, তাই পানি, শুকনো খাবার ও ফল সঙ্গে রাখুন। ফেরার পথে নীলকণ্ঠ টি কেবিনে সাতরং চা খেতে ভুলবেন না। খাবারের প্যাকেট বা বোতল বনে ফেলে আসবেন না।
যাওয়ার সেরা সময়
লাউয়াছড়ায় বছরজুড়েই পর্যটক আসেন, তবে শীতকালে ভিড় সবচেয়ে বেশি। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আবহাওয়া আরামদায়ক, পাখি দেখার জন্যও এই সময় ভালো। বন্যপ্রাণী দেখতে চাইলে সকাল সকাল বনে ঢুকুন, ভোরের দিকে উল্লুক ও পাখিরা সবচেয়ে সক্রিয় থাকে। চা শ্রমিকদের কর্মব্যস্ত জীবন দেখতে চাইলে মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে যান। বর্ষায় বন আরও সবুজ হয়, তবে পথ পিচ্ছিল থাকে আর জোঁকের উপদ্রব বাড়ে।
টিপস ও সতর্কতা
বনে ঢুকে জোরে কথা বলা বা চিৎকার করা থেকে বিরত থাকুন, শব্দে বন্যপ্রাণী ভয় পেয়ে লুকিয়ে পড়ে। নির্দিষ্ট হাঁটা পথের বাইরে যাবেন না, ঘন বনে পথ হারানোর ঝুঁকি থাকে। প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট বা কোনো আবর্জনা বনে ফেলবেন না। বন্যপ্রাণীকে খাবার দেবেন না, এতে তাদের স্বাভাবিক আচরণ বদলে যায়। ভালো গ্রিপের জুতা পরুন, সঙ্গে মশা তাড়ানোর ক্রিম রাখুন। বর্ষায় জোঁক থেকে বাঁচতে লম্বা মোজা পরা ভালো। শিশুদের সবসময় চোখে চোখে রাখুন।
ভোরের বনের জাদু
লাউয়াছড়ার আসল সৌন্দর্য ভোরে। সূর্য ওঠার আগেই বনে ঢুকলে কুয়াশা ভেদ করে আলোর রেখা, পাখির কলরব আর উল্লুকের ডাক মিলে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হয়। ফটোগ্রাফারদের জন্য এই সময়টা সোনালি মুহূর্ত। তবে ভোরে বনে ঢুকতে চাইলে আগের দিনই গাইড ঠিক করে রাখুন, কারণ প্রবেশমুখে সকালে গাইড পাওয়া কঠিন হতে পারে।
নিসর্গ প্রকল্পের ভূমিকা
লাউয়াছড়া নিসর্গ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত, যার লক্ষ্য স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষিত বনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। এই প্রকল্পের ফলে বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান হয়েছে, আর বন সংরক্ষণে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ বেড়েছে। পর্যটক হিসেবে টিকিট কেটে ও গাইড নিয়ে ঘোরা মানে এই সংরক্ষণ কাজে পরোক্ষভাবে সহায়তা করা। বনের নিয়ম মেনে চলা তাই শুধু শিষ্টাচার নয়, সংরক্ষণের অংশ।
বনের বুক চিরে রেললাইন
লাউয়াছড়ার এক বিখ্যাত দৃশ্য বনের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইন। ঘন সবুজের মাঝে রেলপথের এই ছবি পর্যটকদের কাছে খুব জনপ্রিয়। তবে রেললাইনে ছবি তোলার সময় চরম সতর্ক থাকুন, ট্রেন আসার শব্দ বনের নিস্তব্ধতায় দূর থেকে শোনা গেলেও ঝুঁকি নেবেন না। লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন, পাশ থেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে ছবি তুলুন।
কোন হাঁটা পথটি আপনার জন্য
প্রথমবার বনে গেলে ১ ঘণ্টার পথটি ভালো শুরু। এই পথে বনের মূল সৌন্দর্য আর বন্যপ্রাণীর দেখা দুটোই মেলে। হাতে সময় কম থাকলে ৩০ মিনিটের পথে ঘুরে আসুন। আর অভিজ্ঞ ট্রেকাররা ৩ ঘণ্টার পথে বনের গভীরে যেতে পারেন, তবে সঙ্গে গাইড ও পর্যাপ্ত পানি রাখুন। যে পথেই যান, সূর্য ডোবার আগেই বন থেকে বেরিয়ে আসুন।
শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে
লাউয়াছড়ায় শিশুদের নিয়ে যাওয়া যায়, তবে তাদের সবসময় হাতের কাছে রাখুন। ছোটদের জন্য ৩০ মিনিট বা ১ ঘণ্টার পথ উপযুক্ত। বয়স্কদের জন্য লম্বা পথ কষ্টকর হতে পারে, তাই শারীরিক অবস্থা বুঝে পথ বেছে নিন। হুইলচেয়ার বা স্ট্রলার নিয়ে বনের ভেতরে চলা কঠিন, এ বিষয়টি মাথায় রাখুন।
মাধবপুর লেক মিলিয়ে পরিকল্পনা
লাউয়াছড়া থেকে মাধবপুর লেকের দূরত্ব বেশি নয়। সকালে বন ঘুরে দুপুরে মাধবপুর লেকের পাড়ে বিশ্রাম নেওয়া যায়, একদিনে দুটি স্পটই দেখা সম্ভব। লেকের পাড়ে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে বিকেলে শ্রীমঙ্গল শহরে ফিরে সাতরং চা খেয়ে দিন শেষ করা যায়। এভাবে পরিকল্পনা করলে একদিনেই শ্রীমঙ্গলের সেরা অভিজ্ঞতাগুলো পাওয়া যায়।
বর্ষায় জোঁক থেকে সাবধান
বর্ষাকালে লাউয়াছড়ার পথে জোঁকের উপদ্রব বাড়ে। এ সময় গেলে লম্বা মোজা আর বন্ধ জুতা পরুন, পায়ে সরিষার তেল বা লবণ মাখিয়ে নেওয়া যায়। জোঁক ধরলে টেনে ছিঁড়বেন না, লবণ বা আগুনের ছোঁয়ায় ছাড়িয়ে নিন। ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সতর্ক থাকলেই বর্ষার সবুজ বন উপভোগ করা যায় নিরাপদে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: লাউয়াছড়ায় উল্লুক দেখার নিশ্চয়তা আছে কি? উত্তর: নিশ্চয়তা নেই, কারণ এরা বন্য প্রাণী। তবে ভোরে বা সকালে গাইড নিয়ে গেলে দেখার সম্ভাবনা অনেক বাড়ে। তাদের ডাক শোনা যায় প্রায়ই, দেখা মেলা ভাগ্যের ব্যাপার।
প্রশ্ন: বনে একা ঘোরা নিরাপদ কি? উত্তর: নির্দিষ্ট হাঁটা পথে দিনের বেলায় ঘোরা নিরাপদ। তবে প্রথমবার গেলে গাইড নেওয়া ভালো, গাইড বন্যপ্রাণী চিনতে ও পথ দেখাতে সাহায্য করেন।
প্রশ্ন: লাউয়াছড়ায় প্রবেশ টিকিট কত? উত্তর: প্রাপ্তবয়স্কদের ৫০ টাকা, ছাত্রদের ২০ টাকা, বিদেশিদের ৫০০ টাকা। গাড়ি পার্কিং ২৫ টাকা। হার বদলাতে পারে, তাই যাওয়ার আগে যাচাই করে নিন।
প্রশ্ন: কতক্ষণ সময় নিয়ে যাওয়া উচিত? উত্তর: ছোট পথের জন্য ২ ঘণ্টা, আর বনের গভীরে যেতে চাইলে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় রাখুন। সঙ্গে শ্রীমঙ্গলের অন্য স্পট দেখতে চাইলে পুরো দিনের পরিকল্পনা করুন।
