বৃহস্পতিবার সকালে ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি এবং কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়াকে তিনি সরাসরি 'অপরাধ' বলে আখ্যা দিয়েছেন। জাগোনিউজ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিউ ও আয়ের জন্য মানুষকে হেয় করার এই কনটেন্ট সংস্কৃতিরও কড়া সমালোচনা করেছেন এই অভিনেত্রী।
পোস্টে তিনি লিখেছেন, 'এআই ব্যবহার করে কারও নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি করা এবং কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া কোনো বিনোদন নয়। এটি একটি অপরাধ।' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি বানোয়াট কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটেই তার এই প্রতিক্রিয়া।
মেহজাবীনের যুক্তি শুধু কনটেন্ট নির্মাতাদের দিকেই তাকিয়ে নেই, শেয়ারকারীদের দিকেও। তার ভাষ্য, একই কনটেন্ট যখন শত শত কিংবা হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করতে থাকেন, তখন বিষয়টি আর শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এর মধ্য দিয়ে সমাজের মানুষের মানসিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সমাজ হিসেবে মানুষ আসলে কোন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
সম্মানের প্রশ্নে তার বক্তব্য আরও গভীর। কাউকে মানুষ হিসেবে সম্মান করার জন্য তাকে নিজের পরিবারের সদস্য হতে হবে কেন, এই প্রশ্ন তুলেছেন মেহজাবীন। কারও মা কিংবা বোনের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটলে কী হতো, এই চেনা যুক্তির বাইরে গিয়ে মানুষের প্রতি মানুষের সম্মানবোধকেই তিনি গুরুত্ব দিতে বলেছেন। তার মতে, কোনো মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য তাকে মা, বোন কিংবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য হিসেবে কল্পনা করার প্রয়োজন হওয়া উচিত নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ, লাইক, শেয়ার ও ট্রেন্ডিংয়ে থাকার প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও তিনি অস্বীকার করেননি। অনেকের কাছে কনটেন্ট তৈরি এখন জীবিকা নির্বাহের একটি মাধ্যম, এই সংগ্রাম ও বাস্তবতা তিনি স্বীকার করেছেন। তবে প্রশ্ন তুলেছেন, কবে থেকে অন্য একজন মানুষের অপমান ও অসম্মান উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠল? কিছু ভিউ, লাইক, শেয়ার কিংবা সামান্য অর্থের জন্য একজন মানুষের অপমানকে কনটেন্ট তৈরির উপকরণ বানানো কতটা গ্রহণযোগ্য, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন তিনি।
তার পর্যবেক্ষণ, এই ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরির বিষয়টি এখন আর শুধু নারী কিংবা পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভিউ, এনগেজমেন্ট ও ট্রেন্ডিংয়ের প্রতিযোগিতায় যে কেউ এমন কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, আবার যে কেউ এর শিকারও হতে পারেন। এআই প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, কারণ এখন কারও ছবি বা ভিডিও বিকৃত করে বানোয়াট কনটেন্ট বানানো আগের চেয়ে অনেক সহজ।
মেহজাবীন চৌধুরী বাংলাদেশের ছোট পর্দার অন্যতম জনপ্রিয় মুখ, টেলিভিশন নাটক থেকে ওটিটি, সর্বত্র তার অভিনয় প্রশংসিত। চলতি বছর 'রকস্টার' সিনেমা দিয়ে বড় পর্দায়ও পা রেখেছেন তিনি। এমন একজন প্রথম সারির তারকার যখন নিজের নামে বানোয়াট কনটেন্টের শিকার হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে কথা বলতে হয়, তখন বোঝা যায় সমস্যাটা কতটা গভীরে পৌঁছেছে।
কেন এই প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ? ডিপফেক ও এআই-জেনারেটেড ভুয়া কনটেন্ট এখন বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশেও তারকাদের ছবি-ভিডিও বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া, ভুয়া বিজ্ঞাপনে তাদের মুখ ব্যবহার করা নতুন নয়। এমন প্রেক্ষাপটে প্রথম সারির একজন অভিনেত্রীর সরাসরি ও স্পষ্ট ভাষায় কথা বলা ভুক্তভোগীদের পক্ষে সাহস জোগায়, আর নির্বিচারে শেয়ার করা দর্শকদেরও আয়নার সামনে দাঁড় করায়।
এরপর কী? সচেতনদের পরামর্শ, সন্দেহজনক কনটেন্ট দেখলেই শেয়ার না করে প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করা, উৎস যাচাই না করে কিছু ছড়িয়ে না দেওয়া। আর যারা এমন কনটেন্টের শিকার হচ্ছেন, তাদের জন্য আইনি সহায়তা নেওয়ার পথও খোলা। মেহজাবীনের এই পোস্ট অন্তত এই বার্তা দিল, ভিউয়ের নেশায় মানুষের মর্যাদা নিয়ে খেলা আর নীরবে মেনে নেওয়া হবে না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, এ ধরনের কনটেন্ট চোখে পড়লেই প্রথম কাজ প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করা এবং উৎস যাচাই না করে কখনোই শেয়ার না করা। ভুক্তভোগীরা চাইলে সাইবার পুলিশের কাছেও অভিযোগ জানাতে পারেন। আর সবচেয়ে জরুরি, মেহজাবীনের ভাষায়, মানুষের মর্যাদাকে কনটেন্টের কাঁচামাল না বানানো।
