বৃহস্পতিবার সকালে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ভুয়া ও আপত্তিকর ভিডিও ছড়ানোর ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। পোস্টে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, কবে থেকে অন্য একজন মানুষের অপমান আর অসম্মান উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠল।
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ইনস্টাগ্রাম পেজ থেকে মেহজাবীন চৌধুরী ও অভিনেত্রী পরীমনির আপত্তিকর বিকৃত ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বলে ধারণা করা হয়। পরে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের ইনস্টাগ্রাম পেজটি হ্যাক হয়েছিল এবং হ্যাকাররাই ভিডিওগুলো প্রকাশ করেছে। অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের পর ভুয়া কনটেন্টগুলো সরিয়ে নেওয়া হয় এবং চ্যানেলটি দুঃখ প্রকাশ করে।
ফেসবুক পোস্টে মেহজাবীন লিখেছেন, 'এআই ব্যবহার করে কারও নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি করা এবং কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া কোনো বিনোদন নয়। এটি একটি অপরাধ।'
তাঁর মতে, এ ধরনের কনটেন্ট যখন শত শত কিংবা হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করতে থাকেন, তখন বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং এর মধ্য দিয়ে সমাজের মানুষের মানসিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে বলে উল্লেখ করেন এই অভিনেত্রী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিউ, লাইক, শেয়ার ও ট্রেন্ডিংয়ে থাকার প্রতিযোগিতার বাস্তবতা তুলে ধরে মেহজাবীন বলেন, অনেকের কাছে কনটেন্ট তৈরি এখন জীবিকা নির্বাহের একটি মাধ্যম। মানুষের সেই সংগ্রাম ও বাস্তবতাকে তিনি অস্বীকার করেন না। তবে তাঁর প্রশ্ন, অন্য একজন মানুষের অপমান ও অসম্মান কবে থেকে উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠল।
মেহজাবীনের পর্যবেক্ষণ, এ ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরির বিষয়টি এখন আর শুধু নারী কিংবা পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভিউ, এনগেজমেন্ট ও ট্রেন্ডিংয়ের প্রতিযোগিতায় যে কেউ এমন কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার অংশ হতে পারেন, আবার যে কেউ এর শিকারও হতে পারেন।
কাউকে মানুষ হিসেবে সম্মান করার জন্য তাকে নিজের পরিবারের সদস্য হতে হবে কেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন মেহজাবীন। কারও মা কিংবা বোনের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটলে কী হতো, এ ধরনের পরিচিত যুক্তির বাইরে গিয়ে মানুষের প্রতি মানুষের সম্মানবোধকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তবে কনটেন্ট তৈরি করা ব্যক্তির পাশাপাশি সেটি ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর মতে, যারা স্বেচ্ছায় এমন কনটেন্ট শেয়ার করেন, আলোচনা করেন এবং আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেন, তাদের ভূমিকাও ভেবে দেখা জরুরি। পোস্টের শেষাংশে মেহজাবীন লিখেছেন, 'একজন অপরাধীর অপরাধে অংশ নিয়ে নিজের বিবেকহীনতার পরিচয় দেবেন কি না, ভেবে দেখতে পারেন।'
এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরীমনিও। শুক্রবার রাতে ফেসবুক লাইভে এসে তিনি চ্যানেল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলেন এবং শনিবার দুপুরে চ্যানেলটিকে উদ্দেশ করে একটি খোলা পোস্ট দেন।
সাম্প্রতিক সময়ে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তারকাদের নামে ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরির ঘটনা বাড়ছে। এমন কনটেন্ট শুধু সংশ্লিষ্ট তারকার সম্মানহানিই করে না, তাঁদের স্বাভাবিক জীবন, কাজ ও মানসিক শান্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করে। মেহজাবীনের এই পোস্ট সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে এবং এ ধরনের অপরাধমূলক প্রবণতার বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা ও বিবেকবোধ জাগ্রত করার আহ্বান জানিয়েছে।
চ্যানেল কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু সেই আশ্বাস কবে কার্যকর হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন পরীমনি। ভুয়া কনটেন্টের বিরুদ্ধে তারকাদের এই সরব অবস্থান সামনের দিনে এ ধরনের অপরাধ রোধে কী ভূমিকা রাখে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ঘটনার টাইমলাইন এক নজরে দেখলে পুরো চিত্রটা স্পষ্ট হয়। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) চ্যানেলের ইনস্টাগ্রাম পেজে ভিডিওগুলো প্রকাশ পায়। পেজ হ্যাকের দাবি করে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ ভিডিও সরিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে মেহজাবীনের ফেসবুক পোস্ট আসে। শুক্রবার রাতে পরীমনি ফেসবুক লাইভে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আর শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে চ্যানেলকে উদ্দেশ করে খোলা পোস্ট দেন তিনি। পাঁচ দিনের এই ঘটনাপ্রবাহ এখন দেশের শোবিজ অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত প্রসঙ্গ।
মেহজাবীনের পোস্টের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা আরও বেড়েছে। শনিবারও ফেসবুকে বিষয়টি নিয়ে নানা পোস্ট ও মন্তব্য চোখে পড়ছে। এআই দিয়ে ভুয়া কনটেন্ট বানিয়ে তারকাদের হেয় করার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি এ ধরনের কনটেন্ট শেয়ার করার আগে যাচাই করার আহ্বানও জানানো হচ্ছে।
