ভূমিকা বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে দাঁড়িয়ে আছে মহাস্থানগড়, বাংলাদেশের প্রাচীনতম শহর জনপদগুলোর একটি। প্রাচীন পুণ্ড্রনগর বা পৌণ্ড্রবর্ধনপুর নামে পরিচিত এই নগরীর ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ থেকে তৃতীয় শতকে পৌঁছায়। মৌর্য যুগের ব্রাহ্মী শিলালিপি, মৌর্য গুপ্ত পাল সেন যুগের নিদর্শন আর সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের সফরের স্মৃতি নিয়ে মহাস্থানগড় আজও ইতিহাসপ্রেমীদের টানে। দুর্গ নগরী, প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর আর আশপাশের খনন স্থান মিলিয়ে একদিনের ভ্রমণে বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার গভীরে ডুব দেওয়া যায় এখানে।
কেন যাবেন মহাস্থানগড় যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ এর অতুলনীয় ঐতিহাসিক গুরুত্ব। আড়াই হাজার বছরের পুরনো এই নগরীতে হাঁটলে মনে হয় সময়ের পাতা উল্টে প্রাচীন বাংলার রাজধানীতে পৌঁছে গেছেন। সুরক্ষিত দুর্গ নগরীর প্রাচীর, প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আর জাদুঘরে সংরক্ষিত টেরাকোটা ফলক, প্রাচীন মুদ্রা ও ব্রোঞ্জ মূর্তি দেখে বোঝা যায় একসময় এই অঞ্চল কতটা সমৃদ্ধ ছিল। পুরাণের বেহুলা লখিন্দরের কাহিনির সঙ্গে জড়িত গোকুল মেধ আর শাহ সুলতান বলখির মাজার মিলিয়ে ইতিহাস, পুরাণ আর স্থাপত্যের এক অনন্য সমন্বয় এখানে। যারা শুধু প্রকৃতি নয়, ইতিহাস ছুঁয়ে দেখতে চান, তাদের জন্য মহাস্থানগড় অপরিহার্য গন্তব্য।
কী কী দেখবেন মহাস্থানগড়ের কেন্দ্রে আছে সুরক্ষিত দুর্গ নগরী, উত্তর দক্ষিণে প্রায় ১.৫২ কিলোমিটার আর পূর্ব পশ্চিমে প্রায় ১.৩৭ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। দুর্গ এলাকার ভেতরে দেখুন জিয়ৎ কুণ্ড, মানকালির ধাপ, পরশুরামের বাসগৃহ, গোবিন্দ ভিটা নামে পরিচিত মন্দির ধ্বংসাবশেষ আর খোদার পাথর ভিটা। অবশ্যই ঘুরে দেখুন ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, যেখানে টেরাকোটা ফলক, প্রাচীন মুদ্রা, ব্রোঞ্জ মূর্তি ও মৃৎপাত্রসহ খননে পাওয়া অমূল্য নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। দুর্গ থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে গোকুল মেধ, বেহুলা লখিন্দরের বাসরঘর নামে পরিচিত ষষ্ঠ সপ্তম শতকের বৌদ্ধ স্তূপের ধ্বংসাবশেষ। আর আছে শাহ সুলতান বলখি মাহি সওয়ারের মাজার। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী মহাস্থান ও করতোয়া নদীর সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য ইউনেস্কোর সম্ভাব্য তালিকায় আছে, পূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্য নয়।
কীভাবে যাবেন ঢাকা থেকে বগুড়ায় বাসে যেতে সময় লাগে ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা। গাবতলী, মহাখালী, শ্যামলী ও কল্যাণপুর থেকে হানিফ, শ্যামলী, এনা, এসআর, নাবিলসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাস ছাড়ে, ভাড়া ৩৫০ থেকে ১,৮০০ টাকা পর্যন্ত। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর থেকে রংপুর এক্সপ্রেস সকাল ৯টায় ছাড়ে, রবিবার বন্ধ থাকে, আর লালমনি এক্সপ্রেস রাত ১০টা ১০ মিনিটে ছাড়ে, শুক্রবার বন্ধ থাকে। বগুড়া শহর থেকে মহাস্থানগড় যেতে সিএনজি বা অটোরিকশায় সময় লাগে ২০ থেকে ৩০ মিনিট। লোকাল বাসে গেলে ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট লাগে, ভাড়া প্রায় ২০ থেকে ৩০ টাকা। রিজার্ভ সিএনজি নিলে ভাড়া পড়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মতো।
জাদুঘরের টিকিট ও সময় মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। বিদেশি পর্যটকদের জন্য ১০০ টাকা বলে একটি সূত্রে উল্লেখ আছে, তবে তা যাচাই করা যায়নি। সাপ্তাহিক বন্ধ রবিবার, একটি সূত্রে রবি ও সোমবার সকালের কথা বলা আছে, মতভেদ থাকায় যাওয়ার আগে সময় জেনে নেওয়া ভালো। গ্রীষ্মকালে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর জাদুঘর খোলা থাকে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। শীতকালে অক্টোবর থেকে মার্চ খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। মাঝে মধ্যাহ্ন বিরতি থাকে।
সেরা সময় মহাস্থানগড় ঘোরার সেরা মৌসুম অক্টোবর থেকে মার্চ, শীতকালে আবহাওয়া থাকে শীতল ও আরামদায়ক। এই সময় দুর্গ এলাকায় হেঁটে ঘোরা সবচেয়ে সুখকর। গ্রীষ্মে রোদে হাঁটা কষ্টকর হতে পারে, তাই গেলে সকাল সকাল যাওয়া ভালো। বর্ষায় চারপাশ সবুজ হয়, তবে বৃষ্টিতে খনন এলাকায় হাঁটা অসুবিধাজনক হতে পারে।
কোথায় থাকবেন মহাস্থানগড় একদিনের ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী, তাই থাকার পরিকল্পনা বগুড়া শহরে রাখুন। বগুড়া শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল আছে, হোটেল নাজ গার্ডেন, মম ইন, পর্যটন মোটেল, আকবরিয়াসহ আরও অনেক হোটেলের নাম ট্রাভেল সূত্রে পাওয়া যায়, তবে ভাড়া এই গাইডে যাচাই করা যায়নি। ঢাকা থেকে দিনভ্রমণে গেলে থাকার খরচ পুরোপুরি বাঁচানো যায়, সকালে রওনা হয়ে রাতে ফেরা সম্ভব।
খাওয়া বগুড়া শহরে খাওয়ার ভালো ব্যবস্থা আছে। মহাস্থানগড় এলাকায় ছোট দোকানে হালকা খাবার পাওয়া যায়, তবে মূল খাওয়া বগুড়া শহরে সারাই ভালো। বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি সারা দেশে, ফেরার পথে দই কিনে নিতে ভুলবেন না। সঙ্গে পানি রাখুন, বিশেষ করে গ্রীষ্মে দুর্গ এলাকায় হাঁটার সময় পানির প্রয়োজন হয়।
খরচের ধারণা ঢাকা থেকে দিনভ্রমণে বাজেট খরচে জনপ্রতি পড়ে প্রায় ৮০০ থেকে ১,৫০০ টাকা। এর মধ্যে আছে নন এসি বাসে যাওয়া আসা, বগুড়া থেকে লোকাল যাতায়াত, জাদুঘরের টিকিট আর সাধারণ খাওয়া। মাঝারি বাজেটে এসি বাস, রিজার্ভ সিএনজি আর ভালো রেস্তোরাঁয় খাওয়া মিলিয়ে জনপ্রতি খরচ হতে পারে ২,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা। মনে রাখবেন, ভাড়ার অঙ্ক মৌসুম ও পরিবহনভেদে বদলায়। এই ধারণা ট্রাভেল সূত্রের ভিত্তিতে, আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা নয়, যাত্রার আগে ভাড়া জেনে নিন।
বাজেট টিপস খরচ কমাতে দিনভ্রমণের পরিকল্পনা করুন, তাহলে হোটেল খরচ বাঁচে। দলে গেলে বাসের টিকিট আগে কাটুন, ছুটির দিনে ভাড়া বেশি হয়। বগুড়া শহর থেকে লোকাল বাসে গেলে রিজার্ভ সিএনজির তুলনায় অনেক সাশ্রয় হয়। জাদুঘর আর দুর্গ এলাকা একসঙ্গে ঘুরুন, আলাদা দিনে গেলে যাতায়াত খরচ বাড়ে। স্থানীয় গাইড নিলে ইতিহাস বোঝা সহজ হয়, দলে ভাগ করে নিলে খরচ কম পড়ে।
নিরাপত্তা পরামর্শ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে ঘোরার সময় নিয়ম মেনে চলুন, প্রাচীন স্থাপনায় উঠবেন না, নিদর্শনে হাত দেবেন না। গ্রীষ্মে সকাল ১১টার আগেই দুর্গ এলাকা ঘোরা শেষ করার চেষ্টা করুন, রোদে পানিশূন্যতার ঝুঁকি থাকে। মূল্যবান জিনিসপত্র নিরাপদে রাখুন, ভিড়ের মধ্যে সতর্ক থাকুন। সন্ধ্যার আগেই বগুড়া শহরে ফেরার পরিকল্পনা রাখুন। জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলার নিয়ম জেনে নিন, কোথাও নিষেধ থাকলে মেনে চলুন।
একদিনের ট্যুর প্ল্যান মহাস্থানগড় ঘোরার ভালো পরিকল্পনা হলো সকাল ৯টায় জাদুঘর খোলার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে যাওয়া। জাদুঘরে এক থেকে দেড় ঘণ্টা কাটিয়ে দুর্গ নগরীর ভেতরে হাঁটুন, জিয়ৎ কুণ্ড, মানকালির ধাপ, পরশুরামের বাসগৃহ আর গোবিন্দ ভিটা দেখুন। দুপুরের খাবার বগুড়া শহরে সেরে বিকেলে যান গোকুল মেধ আর শাহ সুলতান বলখির মাজার দেখতে। বিকেলের নরম আলোয় প্রাচীন ইটের ধ্বংসাবশেষের ছবি হয় চমৎকার। সন্ধ্যার আগেই বগুড়া শহরে ফিরে আসুন, ফেরার পথে বগুড়ার বিখ্যাত দই কিনতে ভুলবেন না। ঢাকা থেকে দিনভ্রমণে গেলে ভোরের বাস ধরুন, তাহলে পুরো দিনটা কাজে লাগবে।
ইতিহাসের গভীরে মহাস্থানগড়ের গুরুত্ব বোঝা যায় এখানে পাওয়া মৌর্য যুগের ব্রাহ্মী শিলালিপি থেকে, যা প্রমাণ করে খ্রিষ্টপূর্ব যুগেই এটি ছিল প্রশাসনিক কেন্দ্র। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন যুগ পেরিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে এই নগরী ছিল বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। সপ্তম শতকে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এখানে এসেছিলেন, তার বিবরণ থেকে প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের সমৃদ্ধির আভাস পাওয়া যায়। করতোয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই নগরী একসময় নদীপথে বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল। আজকের ধ্বংসাবশেষের প্রতিটি ইট যেন সেই দীর্ঘ ইতিহাসের গল্প বলে।
প্রশ্নোত্তর একদিনে ঘোরা যায় কি? হ্যাঁ, মহাস্থানগড় একদিনের ভ্রমণের জন্য আদর্শ। ঢাকা থেকে সকালে রওনা হয়ে দুর্গ, জাদুঘর, গোকুল মেধ সব ঘুরে রাতে ফেরা যায়। শিশুদের নিয়ে যাওয়া যায় কি? হ্যাঁ, তবে প্রত্নস্থলে শিশুদের দৌড়ঝাঁপ থেকে বিরত রাখুন, প্রাচীন ইটের ধ্বংসাবশেষে পড়ে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। গাইড কি জরুরি? বাধ্যতামূলক নয়, তবে স্থানীয় গাইড নিলে দুর্গের ইতিহাস আর প্রতিটি স্থাপনার গল্প বোঝা অনেক সহজ হয়। বর্ষায় যাওয়া যায় কি? যায়, তবে বৃষ্টিতে খোলা খনন এলাকায় হাঁটা কঠিন হয়, শীতকালই সেরা।
