বিনোদন ঝলক
তারকা

গান নয়, এটা মনির খানের নিজের জীবনের গল্প

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৪ অক্টোবর ২০২৬3 মিনিটে পড়ুন
গান নয়, এটা মনির খানের নিজের জীবনের গল্প

‘বাবা তোমার ছেলে আজ বড় হয়েছে’, মনির খানের এই গান শোনেননি এমন শ্রোতা বাংলাদেশে কমই আছেন। বাবার প্রতি সন্তানের আবেগ, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার যে বয়ান এই গানে আছে, তা ছুঁয়ে যায় প্রতিটি হৃদয়। কিন্তু অনেকেই জানেন না, এটি শুধুই একটি গান নয়। এটি মনির খানের নিজেরই বাস্তব জীবনের গল্প।

সম্প্রতি মাছরাঙা টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে সেই অজানা অধ্যায়ের কথা জানান শিল্পী নিজেই। গানজুড়ে আছে এক গায়কের শূন্য থেকে সফল হওয়ার গল্প। যাকে তার বাবা হারমোনিয়াম কিনে দেন, কিন্তু গ্রামবাসী তাকে গানের চর্চা করতে দেয় না। গান গাওয়ার অপরাধে তার নামে মামলা হয়, বাড়িছাড়া হতে হয়। এমনকি তাকে ও তার বাবাকে মারও খেতে হয়। এই প্রতিটি ঘটনাই ঘটেছে মনির খানের জীবনে।

মনির খান জানান, তাদের বাড়ির পাশেই ছিল মসজিদ। ফলে গানের চর্চা করায় এলাকার অনেকেই বিরোধিতা করতেন। হুজুররা এসে অভিযোগ করতেন। এক পর্যায়ে তার নামে সাত-আটটি মামলাও করা হয় গান গাওয়ার অপরাধে। পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হতো তাকে। পরে আদালতে গিয়ে জামিন নেন তিনি, আর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গান গেয়ে শোনান। গান শুনে বিচারক তাকে বেকসুর খালাস দেন।

বাধা শুধু মামলায় সীমাবদ্ধ ছিল না। গানের চর্চার কারণে একবার এলাকার কিছু লোক হামলাও করে মনির খানের বাড়িতে। তিনি জানান, সে সময় হারমোনিয়ামটি বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন তিনি। আর তাকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন তার বাবা। সে সময় বাবার পিঠেও আঘাত লাগে। ভেঙে যায় হারমোনিয়ামের একটি অংশ। সেই ভাঙা অংশ মেরামত না করেই স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছেন শিল্পী। আজও সেই হারমোনিয়াম একইভাবে সংরক্ষণ করে রেখেছেন তিনি।

তবে এই লড়াইয়ে মনির খান একা ছিলেন না। পাশে ছিলেন তার বাবা। মনির খান জানান, ছোটবেলা থেকেই তার গানের গলা ভালো ছিল। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় না বুঝেই প্রথম হয়ে যেতেন। এই দেখে শিক্ষক বাবা ভাবলেন, ছেলেকে দিয়ে গান গাওয়ানো যেতে পারে। তাই এসএসসি পরীক্ষার পর ছেলেকে কিনে দেন হারমোনিয়াম। সেটা নিয়েই গানের চর্চা করতেন তিনি।

সামাজিক ও ধর্মীয় বাধা এলেও বাবা ছিলেন অবিচল। মনির খানের ভাষায়, তার বাবা ছেলের ভেতরের প্রতিভাকে সামনে আনার জন্য যত বাধাই আসুক, তা অতিক্রম করতে প্রস্তুত ছিলেন। এই সমর্থনই তাকে টিকিয়ে রেখেছিল কঠিন সময়ে।

গ্রামে এত ঝামেলা, আবার গানে বড় হওয়ার স্বপ্ন, দুই মিলিয়ে একদিন ঢাকায় আসেন মনির খান। সঙ্গে ছিল বাবার জমানো ৪০ হাজার টাকা। তিনি যান গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক মিল্টন খন্দকারের কাছে, যাকে তিনি ‘সংগীত পিতা’ বলে মানেন। তার কথা-সুরেই এসেছে মনির খানের সিংহভাগ জনপ্রিয় গান।

শিল্পী জানান, ওই ৪০ হাজার টাকা মিল্টন খন্দকার নেননি। বরং ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে মনির খানকে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। গান করতে করতেই একদিন বাবার ওপর আক্রমণের সেই ঘটনা মিল্টনকে জানান মনির। তিনি বলেন, ঘটনাটি বলার সময় এক পর্যায়ে দেখেন, মিল্টন খন্দকারের চোখ ভিজে গেছে।

পাঁচ-সাত দিন পর মিল্টন খন্দকার তাকে ডাকেন। গানের কথা-সুর শুনে খুব পছন্দ হয় মনিরের। তার কণ্ঠে রেকর্ডিং করা হয়। ডেমো ভয়েস দিয়েই ক্যাসেট রেকর্ড করে বাড়ি চলে যান তিনি। বাবাকে সেটা শোনান, তিনিও অবাক হন। পরে বাবা ক্যাসেট প্লেয়ার নিয়ে এলাকার মানুষের সামনে গিয়ে গিয়ে সবাইকে গানটি শোনাতেন। ছেলেকে নিয়ে গর্ব করতেন, আনন্দে চোখে পানি আসত তার।

মনির খানের সংগীতজীবনের শুরুটা এভাবেই। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘তোমার কোনো দোষ নেই’ তাকে রাতারাতি বিখ্যাত করে দেয়। এরপর একের পর এক সফল অ্যালবাম, অসংখ্য জনপ্রিয় গান। কিন্তু সাফল্যের এই গল্পের পেছনে রয়েছে বাবার ত্যাগ, মামলা-হামলার ভয়াবহ স্মৃতি আর এক শিল্পীর অদম্য লড়াই।

প্রসঙ্গত, মনির খানের বাবা মাহবুব আলী খান মারা গেছেন ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি। বাবার শেখানো আদর্শ আর দিকনির্দেশনা মেনেই তিনি পথ চলেছেন, এখনো চলছেন। ‘বাবা তোমার ছেলে আজ বড় হয়েছে’ গানটি তাই শুধু একটি গান নয়, একজন বাবার প্রতি ছেলের চিরকৃতজ্ঞতার দলিল।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার