বিনোদন ঝলক
সিনেমা

VGIK উৎসবে প্রথমবার বাংলাদেশের ছবি: রাশিয়ার মস্কোয় যাচ্ছে 'নিশি'

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৮ অক্টোবর ২০২৬3 মিনিটে পড়ুন
VGIK উৎসবে প্রথমবার বাংলাদেশের ছবি: রাশিয়ার মস্কোয় যাচ্ছে 'নিশি'

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে আবারও বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে আনল স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র 'নিশি'। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র উৎসব 'ভিজিআইকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র উৎসব'-এর ৪৬তম আসরে নির্বাচিত হয়েছে ছবিটি। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো এই উৎসবে জায়গা করে নিল বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্র। কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রবিবার (১৮ অক্টোবর) এই খবর প্রকাশ করেছে ছবিটির প্রযোজনা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া।

উৎসবটির আয়োজক রাশিয়ার 'গেরাসিমভ ইনস্টিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফি', যা বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। চলচ্চিত্র-শিক্ষার এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত এই উৎসব শিক্ষার্থী ও নবীন নির্মাতাদের জন্য অন্যতম প্রাচীন ও সম্মানজনক আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে স্বীকৃত। এবারের ৪৬তম আসরটি আগামী ১৬ থেকে ২০ নভেম্বর রাশিয়ার মস্কোয় অনুষ্ঠিত হবে, আর সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছে 'নিশি'।

গোলাম রাব্বানী ও জহিরুল ইসলামের যৌথ পরিচালনায় নির্মিত ছবিটির গল্প ও চিত্রনাট্য লিখেছেন গোলাম রাব্বানী নিজেই। ছবির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে চা-বাগানের এক শ্রমিকের মেয়েকে ঘিরে, যার নাম নিশি। পানির সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় তার লেখাপড়া। বাড়িতে একটি নলকূপ বসিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নাবালিকা নিশিকে বিয়ে করতে চায় কাঠ ব্যবসায়ী লালচাঁন। এমন পরিস্থিতিতে একটি শিশুর শিক্ষা, অধিকার ও জীবনের সংকট উঠে এসেছে ছবিটিতে।

ছবির নির্মাণ-দর্শনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো এর অভিনয়শিল্পী নির্বাচন। চলচ্চিত্রটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাস্তব জীবনের মানুষ, পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী নন। চা-শ্রমিকের মেয়ে নিশি নিজেই হয়েছেন ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র, পাশাপাশি আছেন চা-শ্রমিক বিশ্বজিৎ, গণেশ ও ভারতী। এই অ-পেশাদার কাস্টিং ছবিকে দিয়েছে বাস্তবের গভীর স্পর্শ, যা আন্তর্জাতিক উৎসবের বিচারকদের নজরে পড়ার একটি কারণ বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র-বোদ্ধারা।

'নিশি'র নির্মাণে রয়েছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বড় ছাপ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ, গ্রিন ফিল্ম স্কুল অ্যালায়েন্স ও ইউনেসকো ঢাকার সহযোগিতায় নির্মিত হয়েছে ছবিটি। ছবির চূড়ান্ত সম্পাদনা, রঙের বিন্যাস ও শব্দ সংযোজনের কাজ হয়েছে পোল্যান্ডের বিখ্যাত লজ ফিল্ম স্কুলে। চিত্রগ্রহণ করেছেন ওই প্রতিষ্ঠানের সাবেক শিক্ষার্থী নাতালিয়া পুসনিক। আর শুটিং হয়েছে সিলেটের একটি চা-বাগান ও আশপাশের এলাকায়, ফলে ছবির পটভূমি ও চরিত্রদের জীবন দুটোই পেয়েছে অকৃত্রিম বাস্তবতা।

এই অর্জনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নির্মাতা গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, 'বাংলা সিনেমার ইতিহাসে নিশি একের পর এক রেকর্ড গড়ছে, সত্যিই এটা আনন্দের খবর। এই অর্জন শুধু আমাকে নয় আমাদের ফিল্ম ইতিহাসকে বিশ্বের দরবারে সমৃদ্ধ করবে।'

এই নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় প্রেক্ষাপটে। স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি বাণিজ্যিকভাবে মুক্তির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক উৎসবের মাধ্যমে বিশ্বদর্শকের কাছে পৌঁছায়। আর VGIK-এর মতো শিক্ষার্থী-উৎসবে জায়গা পাওয়া মানে নবীন বাংলাদেশি নির্মাতাদের জন্য বিশ্ব-চলচ্চিত্রের দরজা আরও প্রশস্ত হওয়া। তাছাড়া ছবির বিষয়, নাবালিকা বিয়ে, মেয়েশিশুর শিক্ষা ও পানির সংকট, শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক দক্ষিণের বহু সমাজেরই জ্বলন্ত সমস্যা, যা আন্তর্জাতিক দর্শকের সঙ্গে সহজে যুক্ত হয়।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি বাংলাদেশের আরেকটি ছবি 'সাঁকোটা দুলছে'ও পোল্যান্ডের এনার্গাক্যামেরিমেজ ও মিশরের ৪৭তম কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হয়েছে, আর জুনে সাংহাইয়ে পুরস্কারও জিতেছে। ফলে 'নিশি'র এই সাফল্য একক ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক যাত্রার ধারাবাহিক অংশ।

এবার ১৬ থেকে ২০ নভেম্বর মস্কোয় উৎসবের পর্দায় 'নিশি'র প্রদর্শনীর পর নির্মাতাদের লক্ষ্য থাকবে ছবিটিকে আরও আন্তর্জাতিক উৎসবে পাঠানো এবং দেশের দর্শকের কাছেও পৌঁছে দেওয়া। VGIK-এর মঞ্চে প্রথমবার বাংলাদেশের পতাকা ওড়া নিশ্চিতভাবেই দেশের নবীন নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার