বিনোদন ঝলক
সিনেমা

'সাঁকোটা দুলছে' যাচ্ছে পোল্যান্ড ও মিশরের উৎসবে: একসঙ্গে দুই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সিনেমা

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৮ অক্টোবর ২০২৬4 মিনিটে পড়ুন
'সাঁকোটা দুলছে' যাচ্ছে পোল্যান্ড ও মিশরের উৎসবে: একসঙ্গে দুই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সিনেমা

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে আবারও জায়গা করে নিল বাংলাদেশের সিনেমা। তরুণ নির্মাতা ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদের প্রথম সিনেমা 'সাঁকোটা দুলছে' (ইংরেজিতে 'দ্য ব্লাইন্ড গার্ল অ্যান্ড অ্যান এলিফ্যান্ট') একই সঙ্গে নির্বাচিত হয়েছে দুটি আন্তর্জাতিক উৎসবে। পোল্যান্ডের 'এনার্গাক্যামেরিমেজ' উৎসব ও মিশরের ৪৭তম কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা পেয়েছে ছবিটি। বাংলাদেশি স্বাধীন সিনেমার জন্য এটি বড় অর্জন, কারণ দুটি উৎসবই বিশ্ব চলচ্চিত্র মানচিত্রে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সম্মানজনক অবস্থানে আছে।

ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদের এটাই প্রথম সিনেমা। একজন নবীন নির্মাতার প্রথম ছবিই যদি একের পর এক আন্তর্জাতিক মঞ্চে ডাক পায়, সেটা নিঃসন্দেহে বড় ব্যাপার। ছবিটির এই যাত্রা শুরু হয়েছিল গত জুনে। সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে সেখানে পুরস্কার জিতে নেয় 'সাঁকোটা দুলছে'। সাংহাই থেকে সেরা চিত্রগ্রহণের পুরস্কার এসেছিল ছবিটির ঝুলিতে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার এলো একসঙ্গে দুটি উৎসবের ডাক।

পোল্যান্ডের এনার্গাক্যামেরিমেজ উৎসবে ছবিটি শুধু নির্বাচিতই হয়নি, দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে মনোনয়নও পেয়েছে। সেরা পরিচালক বিভাগে মনোনীত হয়েছেন ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদ নিজে, আর সেরা চিত্রগ্রাহক বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছেন সামিউল করিম সুপ্তক। উৎসবটি শুরু হবে ৭ নভেম্বর, চলবে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত। চিত্রগ্রহণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত এই উৎসবে দুটি বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিঃসন্দেহে নির্মাতা দলের জন্য সম্মানের।

অন্যদিকে মিশরের ৪৭তম কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে 'সাঁকোটা দুলছে' জায়গা করে নিয়েছে 'ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিকস উইক কম্পিটিশন' বিভাগে। এই বিভাগে ছবিটি লড়বে দুটি পুরস্কারের জন্য: শাদি আব্দেল সালাম অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট ফিল্ম এবং ফ্যাদি ফারাগ অ্যাওয়ার্ড, যেটি স্পেশাল জুরি প্রাইজ হিসেবে পরিচিত। কায়রো উৎসব চলবে ১১ থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত। অর্থাৎ নভেম্বর মাসের প্রায় পুরোটা জুড়েই বাংলাদেশের এই সিনেমার নাম শোনা যাবে দুটি দেশের উৎসব মঞ্চে।

ছবিটির প্রযোজনার গল্পটাও আলোচনার মতো। 'সাঁকোটা দুলছে' প্রযোজনা করেছেন অভিনেতা মনোজ প্রামাণিক। তার প্রতিষ্ঠান মনপাচিত্রের সঙ্গে যৌথভাবে প্রযোজনা করেছে জার্মানির মগাদোর ফিল্ম। লক্ষণীয় বিষয় হলো, পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদের পাশাপাশি প্রযোজক মনোজ প্রামাণিকেরও এটাই প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। দুই নবীনের হাত ধরে তৈরি এই ছবি এখন বিশ্বের বড় উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, যেটা স্বাধীন ধারার নির্মাতাদের জন্য অনুপ্রেরণার।

নির্মাণশৈলীর দিক থেকেও 'সাঁকোটা দুলছে' গতানুগতিক ধারার বাইরে। পুরো সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে সাদাকালোয়। দৃশ্য বিন্যাস, আলো ও ছায়ার ব্যবহার, স্থির ও দীর্ঘ শট এবং গ্রামীণ জীবনের প্রতি নিবিড় পর্যবেক্ষণ ছবিটির স্বতন্ত্র দৃশ্যভাষা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রায় ৮০ মিনিটের এই সিনেমায় বাণিজ্যিক চমকের বদলে গুরুত্ব পেয়েছে বাস্তবতার নিবিড় পর্যবেক্ষণ।

গল্পের কেন্দ্রে আছে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বসবাসরত তিন নারী। তাদের জীবন, স্বপ্ন এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষার গল্প বলেছে ছবিটি। কুসংস্কার, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো ও নানা বিধিনিষেধের মধ্যে নিজেদের মতো করে বাঁচার পথ খোঁজেন এই তিন নারী। বিশেষ করে একজন অন্ধ তরুণী কীভাবে সব বাধা পেরিয়ে তার স্বপ্নের পথে হাঁটেন এবং হঠাৎ এক রহস্যময় হাতির মুখোমুখি হন, সেটাই সিনেমার মূল বিষয়। এই গল্পবুননে একদিকে আছে সামাজিক বাস্তবতা, অন্যদিকে রূপকধর্মী কল্পনা।

ছবির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সানজিদা আক্তার স্বর্ণা, তাহমিদা রহমান তৌহিদা, সুমাইয়া আক্তার, মুনসিফ মিম, অশোক বেপারী, পঙ্কজ পালিত, রবিউস সানিসহ আরও অনেকে। পেশাদার তারকা-নির্ভরতার বাইরে গিয়ে এই কাস্টিংও ছবির স্বাধীন ধারার পরিচয় বহন করে।

দুটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের একাধিক বিভাগে নির্বাচিত হওয়ার খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নির্মাতা ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদ। তার প্রত্যাশা, এর মধ্য দিয়ে দেশের গল্প ও নির্মাণের আবেদন বিশ্ব দরবারে পৌঁছে যাবে। নবীন নির্মাতার এই প্রত্যাশা একেবারে অমূলক নয়। সাংহাইয়ে পুরস্কার জয়ের পর একসঙ্গে দুটি উৎসবের মনোনয়ন প্রমাণ করে, ছবিটির দৃশ্যভাষা ও গল্প আন্তর্জাতিক বিচারকদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে।

এই অর্জন কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝা দরকার। বাংলাদেশের মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি স্বাধীন ধারার নির্মাণ এখন নিয়মিত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাচ্ছে। 'সাঁকোটা দুলছে'-এর এই যাত্রা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। একজন অভিনেতার প্রযোজক হিসেবে এগিয়ে আসা, জার্মান প্রতিষ্ঠানের যৌথ প্রযোজনা, সাদাকালো নির্মাণ, গ্রামীণ নারীদের গল্প: এই সব উপাদান মিলে ছবিটিকে বাংলাদেশি সিনেমার বৈচিত্র্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

এখন সবার নজর নভেম্বরের দিকে। ৭ থেকে ১৪ নভেম্বর পোল্যান্ডে এবং ১১ থেকে ২০ নভেম্বর কায়রোতে উৎসব চলাকালে জানা যাবে 'সাঁকোটা দুলছে' আরও কোনো পুরস্কার ঘরে তুলতে পারে কিনা। সাংহাইয়ের পর পোল্যান্ড ও কায়রো: এই তিন উৎসবের যাত্রা শেষে ছবিটি দেশের দর্শকের কাছে কবে, কীভাবে পৌঁছাবে, সেটাই হবে পরের বড় প্রশ্ন।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার