বিনোদন ঝলক
তারকা

ক্যানসারের লড়াইয়ে সামিয়া আফরিন: মাথা ন্যাড়া করে পাশে ছেলে-স্বামী

বিনোদন ঝলক ডেস্ক২০ অক্টোবর ২০২৬5 মিনিটে পড়ুন
ক্যানসারের লড়াইয়ে সামিয়া আফরিন: মাথা ন্যাড়া করে পাশে ছেলে-স্বামী

কেমোথেরাপিতে চুল পড়ে যাওয়ার আগেই নিজে থেকে মাথা ন্যাড়া করালেন টেলিভিশন উপস্থাপক সামিয়া আফরিন। আর মায়ের সেই কঠিন মুহূর্তে তাঁকে একা থাকতে দেননি পরিবারের মানুষগুলো। ছেলে আহানাফ আরাবি নিজের হাতে মায়ের মাথা ন্যাড়া করে দিলেন, একটু পর নিজেও মাথা ন্যাড়া করে হাসিমুখে হাজির হলেন। স্ত্রীকে সঙ্গ দিতে মাথার চুল ফেলে দিলেন স্বামী এস এম রেজাউল ইমরানও। ক্যানসারের চিকিৎসায় চুল হারানোর কষ্টটা যেন সামিয়াকে একা বইতে না হয়, পরিবারের সবাই ভাগ করে নিলেন সেই কষ্ট।

ডিম্বাশয় অর্থাৎ ওভারিয়ান ক্যানসারের চিকিৎসায় এখন কেমোথেরাপি নিচ্ছেন সামিয়া। চুল পড়ে যাবে, চিকিৎসক আগেই জানিয়েছিলেন। তাই নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করছিলেন তিনি। প্রথমে চুল ছোট করেন, পরে ছেলের হাতে মাথা ন্যাড়া করান। গত ১৫ সেপ্টেম্বর মাথা ন্যাড়া করার একটি ভিডিও ফেসবুকে পোস্ট করে নিজের অনুভূতি জানিয়েছিলেন সামিয়া। লিখেছিলেন, কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাওয়া নিয়ে মন খারাপ না করে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই, সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারাটাই আসল।

গত ১১ অক্টোবর রাজধানীর বনানীতে নিজের বাসায় প্রথম আলোর সঙ্গে কথা হয় সামিয়ার। সেখানে তিনি বলেন, চুল তো মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য। চুল থাকুক বা না থাকুক, আত্মবিশ্বাসটাই মূল। আল্লাহ তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, হাঁটাচলা করতে পারছেন, এটাই অনেক বড় পাওয়া বলে মনে করেন তিনি।

সামিয়ার ক্যানসারের লড়াই নতুন নয়। ২০২২ সালে প্রথম তাঁর কোলন ক্যানসার ধরা পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শে ওই বছরের এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে যান তিনি। সেখানে পরীক্ষায় জানা যায়, ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপির কথা শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। এমনকি কোনো চিকিৎসা না করেই দেশে ফিরে আসার কথাও ভেবেছিলেন। পরে সিঙ্গাপুরের এক চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যয়বহুল ইমিউনোথেরাপি নিতে রাজি হন। একুশ দিন পরপর দেওয়া সেই চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। প্রথম থেরাপির পর ঢোক গিলতে পারতেন না, ত্বকে হতো চুলকানি। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় হেঁটে চলাফেরা করলেও ফেরার সময় হুইলচেয়ারের প্রয়োজন হয়েছিল। ২০২৩ সালে দেশে ফেরার পরও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন তিনি।

চিকিৎসায় সাড়া পেয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছিলেন সামিয়া। কিন্তু নিয়মিত ফলোআপের মধ্যে জেনেটিক পরীক্ষায় আবার ক্যানসার ধরা পড়ে, এবার ওভারিয়ান ক্যানসার। গত ২২ জুলাই সিঙ্গাপুরে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন তিনি। এখন দেশে চলছে কেমোথেরাপি, আগামী ডিসেম্বরে ছয়টি কেমোথেরাপির কোর্স শেষ হওয়ার কথা। এবারের অভিজ্ঞতা নিয়ে সামিয়া বলেন, খাবারে স্বাদ-গন্ধ কিছুই পান না, মুখ লাল হয়ে যায়, মাথা চুলকায়। তবে এই যন্ত্রণা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না, যিনি এর মধ্য দিয়ে যাবেন, তিনিই বুঝবেন।

এই লড়াইয়ে শুরু থেকেই পাশে আছে পরিবার। স্বামী, দুই ছেলে এবং বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী আবদুর রহিম ও গৃহিণী মা জীবন নাহারকে নিয়ে বনানীতে থাকেন সামিয়া। সাতাশ বছরের দাম্পত্য জীবনে স্বামী রেজাউল ইমরানকে প্রতিটি কঠিন সময়ে পাশে পেয়েছেন তিনি। বড় ছেলে আহানাফ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন। মায়ের প্রথমবার ক্যানসার ধরা পড়ার সময় কানাডায় পড়াশোনা করছিলেন তিনি। মায়ের পাশে থাকতে পড়াশোনা ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন, পরে দেশে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন। মায়ের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া প্রসঙ্গে আহানাফ বলেন, মাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই চুল কেটে দেন, নিজের চুলও কেটে ফেলেন। ক্যাম্পাসে বন্ধুরা কারণ জানতে চাইলে মায়ের কথা বলার পর সবাই সাপোর্ট করেছে।

পরিবারে আরও একজন সন্তান রয়েছে, যার দায়িত্ব নিয়েছেন সামিয়া নিজে। নিজের ভাইয়ের ছেলে আয়মান আওসাফের আইনি অভিভাবকত্ব নিয়েছেন তিনি, আয়মান এখন ও লেভেলে পড়ছে। কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে মেয়ের পাশে এসে বসেন সামিয়ার বাবা আবদুর রহিম। মেয়ের চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ক্যানসারের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। মেয়ের জন্য যে কষ্ট, তা নিজেদের মধ্যেই রাখেন তাঁরা। সবার কাছে মেয়ের জন্য দোয়া চান তিনি। মেয়ের অসুস্থতার কথা বলতে গিয়ে সেই বাবাও নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি।

নিজের অসুস্থতার কথা প্রথম প্রকাশ্যে জানান সামিয়া গত বছর। গত বছরের ২০ মার্চ ঢাকার বনানীতে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের সহায়তায় আয়োজিত 'রিভোগ ওয়্যার টু কেয়ার' নামের পোশাক প্রদর্শনীতে নিজের ক্যানসারের কথা প্রকাশ্যে জানান তিনি। এর আগে কাছের মানুষ ছাড়া অনেকেই তাঁর অসুস্থতার কথা জানতেন না। এর পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যানসার নিয়ে নিয়মিত লিখছেন তিনি। বিশেষ করে রোগের সঙ্গে বসবাস করেও কীভাবে মানসিকভাবে শক্ত থাকা যায়, সে বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন ফেসবুকে।

শুধু নিজের লড়াই নয়, অন্য রোগীদের পাশেও দাঁড়িয়েছেন সামিয়া। আগে থেকেই 'পারপাস বাই সামিয়া' নামে একটি পডকাস্ট করছেন তিনি, সেখানে ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে ক্যানসার রোগীদের জন্য মেডিকেল ক্যাম্প আয়োজন ও তহবিল সংগ্রহের কাজও করছেন। ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় কমানো ও সচেতনতা তৈরিতে ভবিষ্যতে আরও কাজ করতে চান তিনি। তাঁর কথায়, একসময় ক্যানসারকে অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হতো, এখন প্রায় প্রতিটি ঘরেই ক্যানসার ঢুকে যাচ্ছে।

চিকিৎসার ফাঁকে নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টাও করছেন সামিয়া। নিজেকে 'ট্রিট' দিতে একাই থাইল্যান্ড ঘুরতে গেছেন তিনি, ১৩ অক্টোবর সেখানে পৌঁছে দেশে ফিরবেন ২৩ অক্টোবর। এরপর ২৫ অক্টোবর আবার কেমোথেরাপি নেবেন। বারান্দার গাছপালার সঙ্গে সময় কাটান, গান শুনতে ও নিজেও গাইতে ভালোবাসেন, দুই বিড়ালকে খাওয়ান। আপাতত চিকিৎসার বাইরে নতুন কোনো কাজে যুক্ত হতে চান না, কেমোথেরাপি শেষ হওয়া পর্যন্ত উপস্থাপনা নিয়েও ভাবছেন না। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি জীবনের স্বাভাবিক ছন্দটুকু ধরে রাখতে চান তিনি, কারণ অসুস্থতাই তাঁর পুরো পরিচয় হয়ে উঠুক, তা তিনি চান না।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার