দুর্গাপূজার আবহেই সামনে এলো ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র 'দুর্গা'র গল্প। ঋতুস্রাব নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার, নারীর স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার লড়াই নিয়ে নির্মিত হয়েছে ছবিটি। পরিচালনা করেছেন রাজ ব্যানার্জি, প্রযোজনা করেছে মা শঙ্করী পিকচার্স। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত জনপদে এক সাধারণ নারীর অসাধারণ হয়ে ওঠার কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে এতে।
ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা সুন্দরবনের একটি গ্রামকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে ছবির গল্প। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে সেখানে রয়েছে দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য ও নানা সামাজিক কুসংস্কার। বিশেষ করে ঋতুস্রাবকে ঘিরে প্রচলিত ভুল ধারণা নারীদের স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রেক্ষাপটেই গড়ে উঠেছে ছবির দ্বন্দ্ব ও প্রতিবাদের গল্প।
এমন পরিবেশেই বাস করে দুর্গা। সে একজন স্কুলশিক্ষকের স্ত্রী, সাধারণ গৃহবধূ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিচয় হয়ে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী এক নারীর। ঋতুস্রাবকে অপবিত্র মনে করা এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার নিয়ে সামাজিক সংকোচ তাকে ভাবিয়ে তোলে। স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়ার কারণে নারীদের কেন লজ্জা ও বৈষম্যের শিকার হতে হবে, এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় তার প্রতিবাদ।
গ্রামের নারীদের সচেতন করার উদ্যোগ নেয় দুর্গা। প্রথমে অনেকেই দ্বিধায় থাকলেও ধীরে ধীরে কয়েকজন তার পাশে দাঁড়ান। তাঁদের নিয়ে গ্রামেই স্বল্পমূল্যে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় সে। ছোট এই উদ্যোগ একসময় নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার স্বপ্ন হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত প্রতিবাদ থেকে সামষ্টিক পরিবর্তনের এই যাত্রাই ছবির মূল সুর।
ছবির নাম 'দুর্গা' রাখার মধ্যে রয়েছে প্রতীকী তাৎপর্য। দুর্গাপূজার মরসুমে নারীশক্তির আরাধনার আবহে এমন একটি গল্পের সামনে আসা কাকতালীয় নয়। পর্দার দুর্গা যেমন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়ে, তেমনি পৌরাণিক দুর্গাও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ের প্রতীক। এই সমান্তরালতা ছবিটিকে দিয়েছে বাড়তি মাত্রা।
ঋতুস্রাব নিয়ে কুসংস্কার দক্ষিণ এশিয়ায় আজও বাস্তবতা। গ্রামাঞ্চলে এখনো অনেক নারী এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে লজ্জার বিষয় মনে করেন, স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাবে ভোগেন নানা রোগে। এমন প্রেক্ষাপটে 'দুর্গা'র মতো ছবি শুধু বিনোদন নয়, সামাজিক বার্তাও বহন করে। লজ্জার বিষয় ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার বদলে খোলামেলা আলোচনার পথ খুলে দেয় এই ধরনের সিনেমা।
বাংলা সিনেমায় সামাজিক বার্তার ছবির ধারা নতুন নয়, তবে গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাকে কেন্দ্র করে গল্প এখনো বিরল। স্যানিটারি ন্যাপকিনের কারখানা গড়ার মতো বাস্তবধর্মী সমাধান ছবিটিকে শুধু সমস্যা তুলে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বদলে দেখিয়েছে উত্তরণের পথও। দর্শকের কাছে এটাই ছবির বড় আবেদন হতে পারে।
ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির সংযোগ। স্যানিটারি ন্যাপকিনের কারখানা শুধু সচেতনতাই ছড়ায় না, গ্রামের নারীদের জন্য আয়ের পথও খুলে দেয়। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ছাড়া সামাজিক পরিবর্তন টেকে না, এই বোধ থেকেই দুর্গার উদ্যোগ পায় পূর্ণতা। ব্যক্তিগত লড়াই থেকে সমষ্টিগত উদ্যোগে রূপ নেওয়ার এই গল্পই ছবিকে শুধু প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি।
বাংলাদেশের দর্শকের কাছেও এই গল্প অচেনা নয়। সুন্দরবন দুই বাংলার ভাগ করা ঐতিহ্য, সীমান্তের ওপারের গ্রামের কুসংস্কারের চিত্র এপারের দর্শকেরও চেনা। ফলে ভারতীয় বাংলা ছবি হলেও 'দুর্গা'র আবেদন সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে যেতে পারে বাংলাদেশের দর্শকের কাছেও। দুর্গাপূজার এই মরসুমে নারীশক্তির এমন গল্প তাই দুই বাংলার জন্যই প্রাসঙ্গিক।
