বিনোদন ঝলক
তারকা

নব্বইয়ের ‘মাসলস ফ্রম ব্রাসেলস’: ৬৬-এ পা দিলেন জাঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যাম

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৮ অক্টোবর ২০২৬6 মিনিটে পড়ুন
নব্বইয়ের ‘মাসলস ফ্রম ব্রাসেলস’: ৬৬-এ পা দিলেন জাঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যাম

ব্যালেরিনার মতো শরীরের নমনীয়তা, মার্শাল আর্টের দক্ষতা আর চোখধাঁধানো স্প্লিট, এই তিনের সমন্বয়ে নব্বইয়ের দশকে অ্যাকশন সিনেমার আলাদা এক পরিচয় হয়ে উঠেছিলেন জাঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যাম। বেলজিয়ামের এক সাধারণ পরিবার থেকে হলিউডের তারকা হয়ে ওঠার পথটা অবশ্য মোটেও মসৃণ ছিল না। আজ, ১৮ অক্টোবর তার ৬৬তম জন্মদিন। ১৯৬০ সালের এই দিনে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের কাছের বার্খেম-সাঁত-আগাথ এলাকায় জন্মেছিলেন জ্যঁ-ক্লদ ক্যামিল ফ্রাঁসোয়া ভ্যান ভারেনবার্গ, বিশ্ব যাকে চেনে জাঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যাম নামে।

ছোটবেলায় ভ্যান ড্যাম ছিলেন কিছুটা লাজুক, রোগাটে গড়নের এক কিশোর। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিও ছিল তার। ছেলের শারীরিক গঠন ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে তার বাবা তাকে কারাতের প্রশিক্ষণে ভর্তি করান, বয়স তখন মাত্র ১১ বছর। প্রশিক্ষক ক্লদ গেৎজের অধীন শুরু হয় তার মার্শাল আর্টের অনুশীলন। ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে তার শরীর, মানসিকতা ও জীবনযাপনের ধরন। কিশোর বয়সেই কারাতেতে দক্ষতা অর্জন করেন তিনি, ১৮ বছর বয়সে পান ব্ল্যাক বেল্ট। ইউরোপীয় পর্যায়ের কারাতে প্রতিযোগিতাতেও আসে সাফল্য।

কারাতের পাশাপাশি শরীরচর্চা ও বডিবিল্ডিংয়ে মনোযোগী হন ভ্যান ড্যাম। তবে তার প্রশিক্ষণের আরেকটি দিক ছিল ব্যালে। প্রায় পাঁচ বছর ধ্রুপদি নৃত্যের চর্চা করেছিলেন তিনি। বাইরে থেকে কারাতে ও ব্যালে সম্পূর্ণ আলাদা মনে হলেও পর্দায় তার বিশেষত্ব হয়ে ওঠে এই দুইয়ের সমন্বয়। ব্যালে তাকে শরীরের ভারসাম্য, নমনীয়তা ও নিখুঁত শারীরিক নিয়ন্ত্রণ অর্জনে সহায়তা করে। শরীরচর্চায় তার আগ্রহ এতটাই ছিল যে বেলজিয়ামে একটি জিমনেসিয়ামও চালু করেছিলেন। ব্যবসা ভালো চললেও তার স্বপ্ন আটকে ছিল না নিজের দেশে কিংবা শরীরচর্চার জগতে। তিনি হতে চেয়েছিলেন চলচ্চিত্রের নায়ক।

আশির দশকের শুরুর দিকে পকেটে সামান্য অর্থ আর সীমিত ইংরেজি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পা রাখেন ভ্যান ড্যাম। হলিউডে তখন প্রতিষ্ঠিত অ্যাকশন তারকাদের দাপট। সিলভেস্টার স্ট্যালোন, আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার ও চাক নরিসের মতো তারকাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে জায়গা করে নেওয়া ছিল কঠিন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। জীবিকার প্রয়োজনে কখনো পিৎজা পৌঁছে দিয়েছেন, কখনো ট্যাক্সি চালিয়েছেন, কখনো কাজ করেছেন নাইট ক্লাবে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে। অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান ছিল বিস্তর। ১৯৮৪ সালে অ্যাকশন তারকা চাক নরিসের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। মার্শাল আর্টের দক্ষতা নজর কাড়ে নরিসের, আর সিনেমার জগতে প্রবেশের পথ কিছুটা খুলে যায়।

১৯৮৫ সালে 'নো রিট্রিট', 'নো সারেন্ডার' সিনেমায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন ভ্যান ড্যাম। কিন্তু এই কাজ তাকে রাতারাতি তারকা বানাতে পারেনি। সেই সুযোগ আসে ১৯৮৮ সালে। ফ্র্যাঙ্ক ডাক্সের কাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত 'ব্লাডস্পোর্ট' সিনেমায় ফ্র্যাঙ্ক ডিউকস নামের এক মার্শাল আর্ট যোদ্ধার চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। প্রযোজক মেনাহেম গোলান প্রথমে ছবিটি সরাসরি ভিডিওতে মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছিলেন বলে ভ্যান ড্যামের জীবনীতে উল্লেখ আছে। কিন্তু নিজের অভিনীত সিনেমাটির সম্ভাবনায় বিশ্বাস ছিল অভিনেতার। ছবিটির সম্পাদনায়ও তিনি কাজ করেন এবং প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পক্ষে চেষ্টা চালান। শেষ পর্যন্ত 'ব্লাডস্পোর্ট' তাকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়, খুলে যায় নতুন সম্ভাবনার দরজা।

এরপর ১৯৮৯ সালে 'কিকবক্সার' ও 'সাইবর্গ', ১৯৯০ সালে 'লায়নহার্ট' ও 'ডেথ ওয়ারেন্ট'। পরপর এসব সিনেমায় অভিনয় করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন মার্শাল আর্টনির্ভর অ্যাকশন সিনেমার অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে। ভ্যান ড্যামের ডাকনাম হয়ে যায় 'মাসলস ফ্রম ব্রাসেলস', ব্রাসেলসের পেশিবহুল মানুষ। নব্বইয়ের দশক ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়গুলোর একটি। ১৯৯১ সালের 'ডাবল ইমপ্যাক্ট'-এ যমজ দুই ভাইয়ের চরিত্রে, ১৯৯২ সালে রোলান্ড এমেরিখের 'ইউনিভার্সাল সোলজার'-এ ডলফ লুন্ডগ্রেনের সঙ্গে, ১৯৯৩ সালে জন উ পরিচালিত 'হার্ড টার্গেট'-এ, এরপর ১৯৯৪ সালের 'টাইমকপ' ও ১৯৯৫ সালের 'সাডেন ডেথ'। 'টাইমকপ' ছিল বক্স অফিসে তার অন্যতম বড় সাফল্য।

তবে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে হলিউডে অ্যাকশন সিনেমার ধরন বদলাতে শুরু করে। বড় বাজেটের সিনেমায় গল্প, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস ও তারকাদের সমন্বয়ের গুরুত্ব বাড়ে। ভ্যান ড্যাম অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা ও প্রযোজনায় আগ্রহী হন, ১৯৯৬ সালে পরিচালনা করেন 'দ্য কোয়েস্ট'। কিন্তু তার পরবর্তী কয়েকটি সিনেমা আগের মতো সাফল্য পায়নি।

পর্দায় দুর্ধর্ষ যোদ্ধা হিসেবে দেখা গেলেও ব্যক্তিগত জীবনে তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে নানা সমস্যা। তার দাম্পত্য জীবন ছিল অস্থির, একাধিকবার বিয়ে ও বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে গেছেন তিনি। ১৯৮৭ সালে প্রথম সন্তান ক্রিস্টোফার, ১৯৯০ সালে মেয়ে বিয়াঙ্কা এবং ১৯৯৫ সালে ছেলে নিকোলাসের জন্ম হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে মাদকাসক্তির সঙ্গে লড়াইয়ের কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। ২০১২ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের অতীতের ভুল ও আত্মবিধ্বংসী আচরণ নিয়ে কথা বলেন। তবে ১৯৯৯ সালে সাবেক স্ত্রী গ্ল্যাডিস পর্তুগিজকে আবার বিয়ে করেন তিনি।

তবে ভ্যান ড্যামের জীবনের গল্প শুধু পতনের নয়। ২০০৮ সালের 'জেসিভিডি' তার ক্যারিয়ারে বিশেষ একটি বাঁক। এখানে তিনি নিজের নামেই এক কাল্পনিক চরিত্রে অভিনয় করেন। সাধারণ অ্যাকশন নায়কের পরিচিত ছাঁচ থেকে বেরিয়ে এসে এক বিপর্যস্ত, দ্বিধাগ্রস্ত ও দুর্বলতাসম্পন্ন মানুষের চরিত্র ফুটিয়ে তোলেন। ছবিটি সমালোচকদের প্রশংসা পায় ও তার অভিনয়ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ২০১২ সালে 'দ্য এক্সপেন্ডেবলস ২'-তে খলনায়ক জঁ ভিলেনের চরিত্রে সিলভেস্টার স্ট্যালোনের নেতৃত্বে নব্বইয়ের অ্যাকশন তারকাদের স্মৃতি ফিরিয়ে আনেন তিনি। এরপর 'কিকবক্সার: ভেঞ্জেন্স', 'কিকবক্সার: রিটালিয়েশন'সহ বিভিন্ন সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ২০২১ সালে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া 'দ্য লাস্ট মার্সেনারি'-তে একজন সাবেক গোপন এজেন্টের চরিত্রে অভিনয় করেন। অ্যাকশন ও কমেডির মিশ্রণে তৈরি ছবিটি তার পুরোনো ভক্তদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তাকে পৌঁছে দেয়।

ভ্যান ড্যামের সাম্প্রতিক কাজের মধ্যে রয়েছে 'ডার্কনেস অব ম্যান' (২০২৪), 'কিল এম অল ২' (২০২৪) ও 'দ্য গার্ডেনার' (২০২৫)। এসব সিনেমা আগের মতো বিশ্বজুড়ে আলোড়ন না তুললেও অ্যাকশন ঘরানার সঙ্গে তার সম্পর্ক যে এখনো শেষ হয়নি, তা স্পষ্ট। সিনেমার কাজও চলছে, 'কিকবক্সার: আর্মাগেডন' ও 'কার্গো', 'প্রিজন ফাইট', 'রেইড প্যাসিফিক' ইত্যাদি প্রকল্পেও যুক্ত আছেন তিনি। তবে অভিনয়ের বাইরে এবার মনোযোগ দিয়েছেন চিত্রকলায়। চলতি বছরের মার্চে হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি মিউজিয়াম অ্যান্ড আর্ট গ্যালারিতে নিজের আঁকা তৈলচিত্রের প্রদর্শনী করেন তিনি। ৬ ও ৭ মার্চের এই প্রদর্শনীতে ছিল ১২টি শহরকে কেন্দ্র করে আঁকা ছবি, প্যারিস থেকে রিও ডি জেনিরো। এত দিন যাকে দর্শকেরা লড়াইয়ের দৃশ্যে দেখেছেন, তিনি এখন রং ও তুলির মাধ্যমে নিজের ভাবনা প্রকাশ করছেন।

ভ্যান ড্যাম সেই সময়ের অ্যাকশন তারকাদের একজন, যখন কম্পিউটার-নির্ভর দৃশ্যের চেয়ে অভিনেতার নিজের শারীরিক দক্ষতাই ছিল অ্যাকশনের বড় আকর্ষণ। তিনি সব সময় সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছেন, এমন নয়। তার ক্যারিয়ারে ব্যর্থ সিনেমা আছে, ব্যক্তিগত জীবনে সংকট আছে, খ্যাতির শীর্ষ থেকে নেমে আসার অভিজ্ঞতাও আছে। নিজের ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ পার করে এসেছেন তিনি, এতে সন্দেহ নেই। তবে নব্বই দশকের অ্যাকশন সিনেমার ভক্তদের তাতে কিছুই আসে যায় না। সেই সময়ে তিনি যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, সেটার কাছাকাছি যেতে পেরেছিলেন কম নায়কই। ৬৬-তে পা দিয়ে তার গল্প এখনো শেষ হয়নি, হয়তো পরের অধ্যায়টা লেখা হচ্ছে ক্যানভাসে।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার