পাহাড়, ঝরনা, লেক আর আদিবাসী সংস্কৃতি, সব মিলিয়ে বান্দরবান বাংলাদেশের পাহাড়ি ভ্রমণের প্রাণকেন্দ্র। নীলগিরির মেঘ, নাফাখুমের গর্জন, বগা লেকের রহস্যময় পানি আর কেওক্রাডংয়ের চূড়া, প্রতিটি জায়গার আলাদা চরিত্র। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় তরুণ থেকে শুরু করে পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারী, সবার জন্য বান্দরবানে উপযোগী রুট আছে।
বান্দরবান যাওয়ার সেরা সময় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময় আবহাওয়া শুষ্ক ও আরামদায়ক, পাহাড়ি পথে হাঁটা সহজ। অক্টোবর-নভেম্বরে বর্ষার পর ঝরনাগুলোতে পানি থাকে আবার রাস্তাও চলাচলের উপযোগী হয়, তাই ঝরনা দেখার জন্য এটাই সেরা সময়। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পাহাড়ে বেশ ঠান্ডা পড়ে। বর্ষাকালে (জুন-সেপ্টেম্বর) ঝরনা পূর্ণ রূপে থাকে কিন্তু পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল ও ভূমিধসের ঝুঁকি থাকে, এই সময় গভীর ট্রেকিং এড়িয়ে চলা ভালো।
ঢাকা থেকে বান্দরবান শহরের সরাসরি বাস আছে, ভাড়া নন-এসিতে ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা, এসিতে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা, সময় লাগে ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা। চট্টগ্রাম থেকে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টায় যাওয়া যায়। বান্দরবান শহর থেকে আশপাশের স্পটগুলোতে যেতে চান্দের গাড়ি বা জিপ ভাড়া করতে হয়। নীলগিরি, চিম্বুক, নীলাচল একদিনে ঘুরে আসা যায়। নাফাখুম বা আমিয়াখুমের মতো গভীর ঝরনায় যেতে হলে থানচি হয়ে ট্রেকিং করতে হয়, সঙ্গে অভিজ্ঞ গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক।
দেখার জায়গার মধ্যে নীলগিরি অন্যতম, মেঘের ওপর ভাসমান রিসোর্ট এলাকা থেকে সূর্যোদয় অসাধারণ। নীলাচল থেকে বান্দরবান শহর ও আশপাশের পাহাড়ের প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। চিম্বুক পাহাড়ের চূড়া থেকে সাঙ্গু নদীর বাঁক দেখা যায়। মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে ঝুলন্ত সেতু ও চিড়িয়াখানা আছে, পরিবার নিয়ে যাওয়ার জন্য ভালো। বগা লেক প্রায় ১২০০ ফুট উঁচুতে একটি প্রাকৃতিক হ্রদ, এর গভীর নীল পানি নিয়ে নানা লোককথা আছে। কেওক্রাডং দেশের অন্যতম উঁচু চূড়া, ট্রেকিংপ্রেমীদের প্রিয়। আর নাফাখুম, যাকে বাংলাদেশের নায়াগ্রা বলা হয়, বর্ষার পর এর রূপ দেখার মতো।
থাকার জন্য বান্দরবান শহরে নানা মানের হোটেল আছে, ১০০০ থেকে ৪০০০ টাকার মধ্যে ভালো অপশন পাওয়া যায়। নীলগিরিতে সরকারি রিসোর্ট আছে, আগে থেকে বুকিং লাগে। ট্রেকিং রুটে থানচি বা রেমাক্রিতে স্থানীয়দের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা আছে, খরচ কম। খাওয়ার জন্য শহরে বাংলা ও পাহাড়ি খাবারের রেস্তোরাঁ আছে, প্রতিবেলা ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় ভালো খাওয়া যায়। ট্রেকিংয়ে গেলে শুকনো খাবার ও পানি সঙ্গে নিন।
তিন দিন দুই রাতের বান্দরবান ট্রিপে (শহর ও আশপাশের স্পট) জনপ্রতি আনুমানিক খরচ ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। নাফাখুম বা কেওক্রাডং ট্রেকিংসহ চার দিনের ট্রিপে ১২ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা লাগতে পারে, গাইড ও গাড়ি ভাড়া মিলিয়ে। দল বড় হলে জনপ্রতি খরচ কমে।
গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ। গভীর পাহাড়ি এলাকায় যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসন বা সেনাবাহিনীর নির্দেশনা জেনে নিন, কিছু এলাকায় অনুমতি লাগে। অভিজ্ঞ গাইড ছাড়া অপরিচিত ট্রেইলে যাবেন না। বর্ষায় ভূমিধসপ্রবণ এলাকা এড়িয়ে চলুন। পাহাড়ি ছড়া ও ঝরনার পানিতে সাঁতার কাটার সময় সতর্ক থাকুন, স্রোতের ধারণা না থাকলে নামবেন না। আদিবাসী সম্প্রদায়ের রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকুন। আর প্লাস্টিক বর্জ্য পাহাড়ে ফেলে আসবেন না।
