শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, ঢাকের শব্দ আর নতুন পোশাকের ঘ্রাণ। দুর্গাপূজা এলেই শৈশবের এমন সব স্মৃতি মনের দুয়ারে এসে দাঁড়ায় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর। সময় বদলেছে, জীবনে এসেছে সচ্ছলতা, পূজায় নিজের সন্তান থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজনের জন্যও নতুন পোশাক কেনেন তিনি। তবু কোথায় যেন অপূর্ণতা থেকে যায়। বাবার কিনে দেওয়া ছিট কাপড়ের সেই শার্টের গন্ধ আজও খুঁজে ফেরেন এই অভিনেতা।
ছোট ও বড় পর্দার গুণী এই অভিনেতার ব্যস্ততা এখন কাজ আর পরিবার ঘিরে। তবে শারদীয় দুর্গোৎসব এলে তার মন ফিরে যায় গ্রামের বাড়িতে, শৈশবের দিনগুলোতে। তার কাছে পূজা কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন আর প্রিয়জনদের নিয়ে মিলনমেলার উপলক্ষ। পূজার আনন্দ নিয়ে তিনি বলেন, গ্রামের বাড়িতে সবাই মিলে আনন্দ করা, এই পরিবেশ ছোটবেলা থেকে দেখে বড় হয়েছেন, এই সুন্দর পরিবেশটাই তিনি সারা জীবন দেখতে চান।
তবে পূজার আনন্দের সঙ্গে এখন জড়িয়ে আছে বাবাকে হারানোর বেদনা। একসময় বাবার উপস্থিতিতে যে উৎসব পূর্ণতা পেত, সেই মানুষটিকে ছাড়া পূজা এলে স্মৃতির ভার আরও গভীর হয়। বাবা শুধু অভিভাবক ছিলেন না, ছিলেন তার শিক্ষকও। চঞ্চল বলেন, 'আগে বাবা যখন বেঁচে ছিলেন, তখন পূজা বেশি ভালো লাগত। বাবা চলে যাওয়ার পর পূজার সময়ে বাবার কথা বেশি মনে পড়ে।'
শৈশবের পূজার স্মৃতিতে ডুব দিলে চঞ্চলের চোখে ভেসে ওঠে গ্রামের চেনা ছবি। পূজা আসার অনেক আগে থেকেই শুরু হতো উৎসবের প্রস্তুতি। পাল মশাইয়ের প্রতিমা বানানো থেকে শুরু করে দেবী বিসর্জন পর্যন্ত পুরো গ্রাম মেতে থাকত আনন্দে। সারা বছর ধরে অপেক্ষা করতেন এই দিনগুলোর জন্য। শরতের কাশফুলে সাদা হয়ে থাকত পদ্মার চর। আর সবচেয়ে বড় লোভ, আনন্দ আর উত্তেজনা কাজ করত নতুন পোশাক পাওয়ার আশায়।
কিন্তু সেই আনন্দের পেছনে ছিল অভাবের কঠিন বাস্তবতা। সারা বছর নতুন পোশাক কেনার সুযোগ হতো না। পূজা এলেই বাবা চেষ্টা করতেন সাধ্যমতো সব সন্তানকে নতুন জামা কিনে দিতে। বাজার থেকে ছিট কাপড় কিনে নিজেই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন দর্জির কাছে। আর নতুন শার্ট হাতে পাওয়ার আগপর্যন্ত চলত প্রতিদিনের অপেক্ষা। প্রতিদিন দর্জির কাছে গিয়ে বসে থাকতেন চঞ্চল: কাপড় কাটা হলো কি না, সেলাই হলো কতটুকু, বোতাম লাগানো শেষ হলো কি না দেখার জন্য।
নতুন শার্ট হাতে পাওয়ার মুহূর্তটি ছিল চঞ্চলের কাছে এক অন্য রকম উৎসব। নতুন কাপড়ের ঘ্রাণে মেতে থাকতেন তিনি। সেই শার্টের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা, ছোট ছোট স্বপ্ন আর বাবার ভালোবাসা। ধীরে ধীরে বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে সমর্থ পরিবারে, ভাইয়েরাও লেখাপড়া শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন যার যার মতো। বাবা-মায়ের নিদারুণ কষ্টের সংসারে ফিরে এসেছে সচ্ছলতা।
জীবনের সেই কঠিন সময় পেরিয়ে এখন পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটানোর দায়িত্ব নিয়েছেন চঞ্চল নিজেই। পূজা এলে নিজের সন্তান, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের উপহার দেন নতুন পোশাক। অন্যদের কাছ থেকেও পান নানা উপহার। অথচ এত আয়োজনের মধ্যেও শৈশবের সেই একটি শার্টের ঘ্রাণ আর ফিরে আসে না। ঘরভর্তি নতুন পোশাকের মধ্যেও তিনি খুঁজে ফেরেন বাবার কিনে দেওয়া ছিট কাপড়ের সেই গন্ধ।
তারকারা পূজায় গ্ল্যামারের গল্প শোনালেও চঞ্চলের এই স্মৃতিচারণ অনেক সাধারণ মানুষের শৈশবের সঙ্গে মিলে যায়। আর সেটাই এই ফিচারের সবচেয়ে বড় আবেদন। জীবন বদলায়, অভাবের দিন পেরিয়ে আসে সচ্ছলতা, পূজার আনন্দও নতুন রূপ পায়। কিন্তু শৈশবের কিছু অনুভূতি কখনো পুরোনো হয় না।
