পুজোর শো-যুদ্ধের চতুর্থ ছবি 'এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র'-এর প্রথম চার দিনের ট্রেড-হিসাব এলো। স্যাকনিল্কের দিনভিত্তিক হিসাবে ছবিটি প্রথম দিনে নিট আয় করেছে ০.১০ কোটি রুপি, দ্বিতীয় দিনে ০.১৩ কোটি, তৃতীয় দিনে ০.১৬ কোটি ও চতুর্থ দিনে ০.১৮ কোটি। চার দিন মিলিয়ে ভারতে মোট নিট আয় ০.৫৭ কোটি রুপি; বিশ্বব্যাপী গ্রস ০.৬৩ কোটি। অর্থাৎ দিনে দিনে আয় বাড়ছে, কিন্তু পুজোর বাকি তিন প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় এই ছবি এখনো পিছিয়ে।
তুলনাটা স্পষ্ট করতে চার ছবির সংখ্যা পাশাপাশি রাখা যাক। 'দ্য একেন: কেরালায় কুরুক্ষেত্র' প্রথম দিনে নিট আয় করেছিল ৭৭ লাখ রুপি, যা ২০২৬ সালের সেরা বাংলা ওপেনিং। 'বহুরূপী দ্য গোল্ডেন ডাকু'-এর প্রথম দিনের নিট ছিল ৪৭ লাখ। আর দেব-শুভশ্রীর 'দেশু ৭' তিন দিনে মোট নিট আয় করেছে ২.৪৭ কোটি রুপি; তৃতীয় দিন একদিনেই ৯৮ লাখ। এই প্রেক্ষাপটে 'এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র'-এর চার দিনের ৫৭ লাখ মানে, শো-যুদ্ধের দৌড়ে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি এখন চতুর্থ স্থানে। তবে একটা ইতিবাচক দিক আছে: প্রতিদিনই আগের দিনের চেয়ে বেশি আয় করেছে ছবিটি, ০.১০ থেকে ০.১৮ কোটিতে ওঠার ধারা অব্যাহত।
ছবির বিষয়বস্তুটা বোঝা জরুরি, কারণ এই শো-যুদ্ধে এটাই একমাত্র ইতিহাসনির্ভর ছবি। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'পথের দাবী' উপন্যাসকে কেন্দ্র করে তৈরি গল্পে উঠে এসেছে সাহিত্য, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির সংঘাত। ১৯২৭ সালে 'পথের দাবী'-র ওপর ব্রিটিশ সরকারের নিষেধাজ্ঞার ঘটনা ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। শরৎচন্দ্রের চরিত্রে অভিনয় করেছেন টোটা রায়চৌধুরী; 'পথের দাবী'-র বিপ্লবী চরিত্র সব্যসাচী মল্লিকের ভূমিকায় আবির চট্টোপাধ্যায়; গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন মিমি চক্রবর্তী। পরিচালনা ও চিত্রনাট্য সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের।
ছবির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও কিছু বিশেষ দিক। 'এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র'-এর মাধ্যমে সৃজিত মুখোপাধ্যায় সংগীত পরিচালনাতেও নতুন ভূমিকায় এসেছেন। ছবির ট্রেলার প্রকাশের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল দেউলটির শরৎ কুটিরকে; যে বাড়িতে শরৎচন্দ্র জীবনের শেষ বারো বছর কাটিয়েছিলেন। ফলে ছবির বিষয়বস্তুর সঙ্গে বাস্তব ইতিহাসের যোগটাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৫ অক্টোবর মুক্তি পাওয়া ছবিটি বিতরণ করেছে পিভিআর ইনক্স পিকচার্স।
কেন এই তুলনা গুরুত্বপূর্ণ? পুজোর মৌসুম পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ছবির সবচেয়ে বড় ব্যবসার মৌসুম। একই সপ্তাহে চারটি বড় ছবির মুখোমুখি লড়াইয়ে কোন ছবি কতটা দর্শক টানছে, সেটাই নির্ধারণ করে পরের সপ্তাহের শো-সংখ্যা। প্রথম চার দিনের হিসাবে 'এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র' পিছিয়ে থাকলেও ধারাবাহিক বৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে পারলে দ্বিতীয় সপ্তাহে মুখের কথায় (ওয়ার্ড অফ মাউথ) ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকছে। মনে রাখতে হবে, এসবই ট্রেড-ট্র্যাকারের আনুমানিক হিসাব; প্রযোজকের চূড়ান্ত সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে।
চার ছবির মুক্তির সময়সূচিটা মনে রাখলে শো-যুদ্ধের চিত্রটা আরও পরিষ্কার হয়। 'এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র', 'দ্য একেন: কেরালায় কুরুক্ষেত্র' ও 'বহুরূপী দ্য গোল্ডেন ডাকু', এই তিনটি মুক্তি পায় ১৫ অক্টোবর। দেব-শুভশ্রীর 'দেশু ৭' আসে একদিন পর, ১৬ অক্টোবর। অর্থাৎ 'এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র' সময়ের দিক থেকে কোনো অসুবিধায় ছিল না; বরং পুজোর ছুটির পুরো সুবিধাই পেয়েছে।
পুজোর মৌসুম পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ছবির সবচেয়ে বড় ব্যবসার মৌসুম। ইটিভি ভারতের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুজোর ছুটিতে প্রেক্ষাগৃহে নতুন বাংলা ছবি দেখার অভ্যাস বাঙালি এখনো ঝেড়ে ফেলেনি; তাই বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এই মৌসুমে বক্স-অফিস নিয়ে নির্মাতাদের প্রত্যাশা থাকে আলাদা। সেই প্রত্যাশার বাজারে চারটি ছবিই নেমেছিল ভিন্ন ভিন্ন ঘরানা নিয়ে: ইতিহাসনির্ভর 'এম্পেরর', রহস্য-অ্যাডভেঞ্চারের 'দ্য একেন', অ্যাকশনের 'বহুরূপী ২' ও রোমান্স-অ্যাকশনের 'দেশু ৭'।
বিষয়বস্তুর দিক থেকে 'এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র'-এর অবস্থানটা অনন্য। 'পথের দাবী' শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এমন এক উপন্যাস, যার ওপর ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের সঙ্গে তাঁরই সৃষ্ট বিপ্লবী চরিত্র সব্যসাচীর সম্পর্ককে পর্দায় নতুনভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন সৃজিত। এই ঐতিহাসিক-সাহিত্যিক ভিত্তি ছবিটিকে বাকি তিনটি বাণিজ্যিক ছবির থেকে আলাদা করে; কিন্তু বক্স-অফিসের সংখ্যা বলছে, পুজোর দর্শক এবার বাণিজ্যিক ঘরানার দিকেই বেশি ঝুঁকেছে।
তবে হাল ছাড়ার সময় এখনো আসেনি। প্রতিদিন আয় বাড়ার ধারা (০.১০ থেকে ০.১৮ কোটি) বলছে, ছবিটি ধীরে ধীরে দর্শক খুঁজে পাচ্ছে। পুজোর ছুটি শেষে দ্বিতীয় সপ্তাহে শো-সংখ্যা কমতে পারে, কিন্তু মুখের কথায় ভালো সাড়া পেলে ঐতিহাসিক-ঘরানার ছবির দীর্ঘমেয়াদি চলার নজিরও আছে। আগামী কয়েক দিনের দৈনিক হিসাবই বলে দেবে, 'এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র' এই শো-যুদ্ধে সম্মানজনক অবস্থানে শেষ করতে পারে কিনা।
শো-যুদ্ধের পরের রাউন্ড এখনো বাকি। পুজোর ছুটি শেষ হলেও চারটি ছবিই প্রেক্ষাগৃহে চলছে; নতুন বড় বাংলা রিলিজ না আসা পর্যন্ত এই চারজনের লড়াইই বক্স-অফিসের মূল আকর্ষণ। স্যাকনিল্কের দিনভিত্তিক হিসাব প্রতিদিন হালনাগাদ হয়, তাই 'এম্পেরর ভার্সেস শরৎচন্দ্র'-এর ধারাবাহিক বৃদ্ধি বজায় থাকলে আগামী দিনগুলোতে তুলনার চিত্রটা বদলাতেও পারে।
