হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বুধবার ভোরে মারা গেছেন নীলফামারীর জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী ফারুক ভূঁইয়া। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার সকাল ৬টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬০ বছর। তাঁর মৃত্যুতে উত্তরবঙ্গের সংগীতাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন ফারুক ভূঁইয়া। দ্রুত তাঁকে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাঁকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। রাতে হৃদরোগ ইউনিটে ভর্তি রেখে চিকিৎসা চললেও ভোরে সব চেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ফারুক ভূঁইয়া ছিলেন নীলফামারীর লোকসংগীতের এক পরিচিত মুখ। তাঁর নিজের লেখা গান ‘বাংলাদেশের মাইনষিগিলা তোমাক দেওছো নিমন্ত্রণ, নীলফামারী একবার বেড়ে যাও। আলু বাইগন তরকারি, শিদল পুড়ি ভর্তা করি একবার খায়া যাও’ গানটি দিয়ে তিনি এলাকার মানুষের মুখে মুখে পরিচিতি পান। খ্যাতিমান ভাওয়াইয়া শিল্পী মহেশ চন্দ্র রায় এই গানটির সুর করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘অন্তরঙ্গ’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে প্রথম তাঁর কণ্ঠে গানটি প্রচারিত হয়, সেই থেকে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে গানটি এলাকার মানুষের কাছে অমর হয়ে আছে।
স্টেজ শো-এর পাশাপাশি তিনি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী। নিজে গানের কথা লিখতেন, সুরও করতেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে ‘হাজরা বিবির কান্দন শুনলে দুঃখে কইলজা যায় ফাটি’ এবং ‘দেওয়ানা দেওয়ানা আমি দেওয়ানা হইলাম রে, আছির বাবার লাগি আমি দেওয়ানা হইলাম রে’। সংগীতশিল্পী আনান সিদ্দিকার ভাষ্য, এক দশকের বেশি সময় ধরে শ্বাসকষ্টসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন ফারুক ভূঁইয়া, তবু গান ছাড়েননি কখনো।
সংগীতের বাইরেও সংগঠক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। নিজ উদ্যোগে তিনি নীলফামারীতে কিংবদন্তি শিল্পী ফিরোজ সাঁই ও পিলু মমতাজ স্মৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন গুণী শিল্পীকে সম্মাননা দিয়ে এসেছেন তিনি। গত ২৯ আগস্ট নীলফামারী শহীদ মিনারে সংসদের ২৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানও করেন তিনি।
জানা গেছে, চলতি বছরের ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর রেডিসন ব্লু হোটেলে কালজয়ী গানের এক অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেছিলেন ফারুক ভূঁইয়া। সহকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটিই ছিল তাঁর জীবনের শেষ স্টেজ শো। মাত্র আট দিনের ব্যবধানে এই শিল্পীর প্রয়াণ সংগীতাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করল।
ফারুক ভূঁইয়ার জন্ম ১৯৬৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নীলফামারী পৌরসভার হারোয়া গ্রামে। তাঁর বাবা মরহুম আব্দুল গণি ভূঁইয়া ছিলেন ব্যবসায়ী। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন।
বুধবার বাদ মাগরিব নীলফামারী কলেজ স্টেশন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে নীলফামারী পৌর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জানাজায় এলাকার সর্বস্তরের মানুষ, সহশিল্পী ও সংগীতপ্রেমীরা অংশ নেন। নিজের এলাকার মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন এই লোকশিল্পী, যার কণ্ঠে নীলফামারীর মানুষ দশকের পর দশক ধরে নিজেদের গান শুনে এসেছে।
