বলিউড অভিনেতা ইমরান খানকে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর তাঁর পাশে দাঁড়ালেন নির্মাতা কিরণ রাও ও অভিনেত্রী সাবা আজাদ। আগামী ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ইমরানকে ভারত ছাড়তে বলেছে দেশটির ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও)। এই নির্দেশের খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইমরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এই দুই তারকা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ইনস্টাগ্রামে ইমরানকে নিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় কিরণ রাও প্রথমে বিস্ময় প্রকাশ করে লেখেন, 'বাহ, এবার মুম্বাই পুলিশও?' এরপর ইমরানের জীবনের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি লেখেন, '৪৩ বছর বয়স। এর মধ্যে ৪০ বছরই ভারতে। এখানে পড়াশোনা করেছে, কাজ করেছে, সফল হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে, ভালোবেসেছে ও লড়াই করেছে।' ইমরান খান অভিনেতা আমির খানের ভাগনে, আর কিরণ রাও আমির খানের সাবেক স্ত্রী। সেই সূত্রে দীর্ঘদিন ধরেই ইমরানকে চেনেন কিরণ।
ইমরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন অভিনেত্রী সাবা আজাদও। বলিউড তারকা হৃতিক রোশনের সঙ্গে সম্পর্কে থাকা এই অভিনেত্রী খবরটি দেখে লিখেছেন, 'কী! এটা পুরোপুরি বাজে কথা।' দুজনের এই প্রতিক্রিয়া মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, আর ভক্তদের অনেকেই ইমরানের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
বিতর্কের সূত্রপাত ১০ অক্টোবর। সেদিন মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন ইমরান খান। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আয়োজিত ওই বিক্ষোভে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম, অর্থাৎ স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল, নির্বাচন কমিশনের এই কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগের জবাব দিতে হবে।
ওই কর্মসূচিতে ইমরানের সঙ্গে তাঁর সঙ্গী লেখা ওয়াশিংটনও অংশ নিয়েছিলেন। পরে দুজনকেই সাময়িকভাবে আটক করে মুম্বাই পুলিশ। আটক হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে পুলিশের গাড়ির ভেতর থেকে তোলা একটি ছবি প্রকাশ করেন ইমরান। ছবির ক্যাপশনে রসিকতা করে তিনি লেখেন, 'মনে হচ্ছে, গাড়িতে করে ঘুরতে যাচ্ছি।' আটকের আগে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছিলেন অভিনেতা। ইমরান বলেন, 'আমার কোনো দাবি নেই। আমি এখানে একজন নাগরিক হিসেবে, এই শহরে বসবাসকারী একজন মানুষ হিসেবে এসেছি। কেন মানুষের চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করা হচ্ছে, কেন মানুষের কণ্ঠস্বর দমিয়ে রাখা হচ্ছে, সেটাই দেখতে এসেছি।'
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর ইমরানকে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করে এফআরআরও। নোটিশে ২০২৫ সালের অভিবাসন ও বিদেশি নাগরিকবিষয়ক আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা কিরিট সোমাইয়া অভিযোগ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট ও ওসিআই কার্ড থাকা সত্ত্বেও ইমরান ১০ অক্টোবর মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। তাঁর অভিযোগের পরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এফআরআরওর নির্দেশের বিরুদ্ধে বোম্বে হাইকোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইমরান। তাঁর আইনজীবী জুলফিকার মেমন জানিয়েছেন, নোটিশকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে আবেদন করা হবে। শুক্রবার অথবা সোমবারের মধ্যে আবেদনটি জমা পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনজীবী দলের যুক্তি, ওসিআই কার্ডধারীদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ, এমন কোনো নির্দিষ্ট বিধান সংশ্লিষ্ট আইনে নেই। তাঁদের মতে, ভারত ছাড়ার নির্দেশটি অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ।
ইমরানের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের ম্যাডিসনে। তাঁর বাবা অনিল পাল ও মা নুজহাত খানের বিচ্ছেদের পর মায়ের সঙ্গে মুম্বাইয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি। মায়ের পদবি গ্রহণ করে পরিচিত হন ইমরান খান নামে। 'জানে তু...ইয়া জানে না', 'আই হেট লাভ স্টোরিজ' ও 'দিল্লি বেলি'র মতো সিনেমায় অভিনয় করে হিন্দি চলচ্চিত্রে পরিচিতি পান তিনি। তবে ভারতীয় সিনেমায় কাজ করলেও সে সময় তিনি ওয়ার্কিং ভিসায় দেশটিতে অবস্থান করছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে ১৫ বছর আগের একটি সাক্ষাৎকারও এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০১১ সালে 'মেরে ব্রাদার কি দুলহান' সিনেমার প্রচারের সময় ইমরান জানিয়েছিলেন, তাঁর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্ট থাকলেও তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে আগ্রহী। তখন তিনি বলেছিলেন, 'আমি ভারতীয় পাসপোর্ট পাওয়ার চেষ্টা করছি। এ সংক্রান্ত সরকারি প্রক্রিয়া চলছে।' সে সময় তাঁর স্ত্রী ছিলেন ভারতীয় নাগরিক অবন্তিকা মালিক। ইমরান বলেছিলেন, 'আমি মনে করি, নিজের দেশের সেবা করা আমার দায়িত্ব। আমি এখানকার নাগরিক নই বলে ভোট দিতে পারি না। তবে নিজেকে এই দেশেরই একজন মনে করি।'
এই ঘটনা এখন শুধু একজন অভিনেতার ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে নেই। ওসিআই কার্ডধারীদের অধিকার, বিদেশি নাগরিকদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সীমা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সব মিলিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এই নির্দেশ। বলিউডের ভেতর থেকে যেমন সমর্থনের সুর উঠেছে, তেমনি আইনি লড়াইয়ের দিকেও এখন সবার নজর। এখন দেখার বিষয়, বোম্বে হাইকোর্টে ইমরানের আবেদনের কী পরিণতি হয়, আর ২৮ অক্টোবরের সময়সীমার আগেই এই বিতর্কের কোনো নিষ্পত্তি হয় কিনা।
