দিনাজপুর শহর থেকে উত্তরে কান্তনগর গ্রামে ঢেপা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর টেরাকোটা মন্দিরগুলোর একটি, কান্তজিউ মন্দির। দূর থেকে দেখলে মনে হয় লালচে ইটের বিশাল এক রথ যেন থেমে আছে সবুজ মাঠের মাঝখানে। কাছে গেলে চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে হাজার হাজার পোড়ামাটির ফলক, যেখানে খোদাই করা আছে মহাভারত আর রামায়ণের কাহিনি, কৃষ্ণের লীলা আর তিন শ বছর আগের বাংলার সমাজজীবন। যারা ইতিহাস ভালোবাসেন, যারা স্থাপত্য দেখতে পছন্দ করেন, আর যারা ধর্মীয় উৎসবের রঙিন আবহ উপভোগ করতে চান, সবার জন্যই এই মন্দির একদিনের স্মরণীয় ভ্রমণ হতে পারে।
কেন যাবেন
কান্তজিউ মন্দিরের ইতিহাস শুরু ১৭০৪ সালে, যখন দিনাজপুরের মহারাজা প্রাণনাথ এই মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মন্দিরের ভিত্তিফলকের সংস্কৃত শিলালিপি থেকে জানা যায়, পিতার ইচ্ছা পূরণে পুত্র রাজা রামনাথ ১৭৫২ সালে (শকাব্দ ১৬৭৪) নির্মাণকাজ শেষ করেন। মন্দিরটি কৃষ্ণ ও তার স্ত্রী রুক্মিণীকে উৎসর্গ করা। একসময় এটি ছিল নবরত্ন শৈলীর মন্দির, অর্থাৎ নয়টি চূড়া ছিল এর মাথায়। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে সেই নয়টি চূড়াই ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু তিনতলা মূল কাঠামো আর টেরাকোটার অলংকরণ টিকে আছে। প্রতিটি ইঞ্চি দেয়ালে পোড়ামাটির ফলকে ফুটে উঠেছে দেবদেবীর কাহিনি, যোদ্ধাদের বীরত্ব, আর জমিদারি আমলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন। সংখ্যায় প্রায় পনেরো হাজার টেরাকোটা কাজ আছে বলে ধারণা করা হয়। ধর্মীয় দিক থেকেও মন্দিরটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর কার্তিক মাসে এখানে বসে মাসব্যাপী রাসমেলা, যা সুন্দরবনের দুবলা দ্বীপ আর শ্রীমঙ্গলের মণিপুরি সম্প্রদায়ের রাসমেলার পাশাপাশি দেশের অন্যতম প্রধান রাস উৎসব। ফাল্গুন মাসে দোল পূর্ণিমায় দোলযাত্রা বা হোলি উৎসবও পালিত হয়, তখন মূল মন্দির থেকে প্রায় তিনশ গজ পূর্বের পুরোনো দোলমঞ্চে বিগ্রহ স্থাপন করা হয়।
কী কী দেখবেন
মূল মন্দির ভবনটি তিনতলা পিরামিড আকৃতির, উচ্চতা প্রায় পঞ্চাশ ফুট। নিচতলা আর দোতলায় একত্রিশটি করে খিলানপথ আছে, তিনতলায় তিনটি। প্রতিটি খিলান, প্রতিটি স্তম্ভ আর দেয়ালের প্রতিটি ফলক মনোযোগ দিয়ে দেখার মতো। গর্ভগৃহে রাধা-কৃষ্ণের বিগ্রহ আছে, ভক্তরা দূর থেকে প্রণাম করেন। মন্দিরের পাশেই আছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইট মিউজিয়াম, যেখানে মন্দিরের ইতিহাস ও নির্মাণকাজ সম্পর্কিত প্রত্নবস্তু সংরক্ষিত আছে। মন্দির চত্বর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, চারপাশে সবুজ ঘাস আর গাছপালা, ছবি তোলার জন্য চমৎকার পরিবেশ। সময় থাকলে আশপাশের আরও কয়েকটি জায়গা ঘুরে আসতে পারেন। কাছেই নয়াবাদ মসজিদ, যেটি সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে কান্তজিউ মন্দিরের নির্মাণকারিগররা নিজেদের ব্যবহারের জন্য এটি বানিয়েছিলেন। দিনাজপুর শহরের দিকে ফেরার পথে রামসাগর দিঘি আর দিনাজপুর রাজবাড়িও দেখে নেওয়া যায়।
টেরাকোটা ফলকগুলো ভালো করে দেখতে সময় নিন, কারণ প্রতিটি ফলকই একেকটি গল্প বলে। কোথাও রাম-রাবণের যুদ্ধ, কোথাও কৃষ্ণের বাল্যলীলা, আবার কোথাও জমিদারি আমলের শিকার দৃশ্য, নৌকাবাইচ বা নারীদের দৈনন্দিন কাজের ছবি। এই সামাজিক দৃশ্যগুলোই মন্দিরটিকে শুধু ধর্মীয় স্থাপনা থেকে ইতিহাসের জীবন্ত দলিলে পরিণত করেছে। আলোকচিত্রীদের জন্য পরামর্শ, দুপুরের কড়া রোদের বদলে সকাল বা বিকেলের কাত করা আলোয় ফলকের খোদাইয়ের ছায়া স্পষ্ট ধরা পড়ে। মিউজিয়ামে মন্দিরের নির্মাণকৌশল, সংস্কারকাজ আর উদ্ধার হওয়া প্রত্নবস্তু দেখে নিলে পুরো ভ্রমণের প্রেক্ষাপট পরিষ্কার হয়।
কীভাবে যাবেন
বাসে: ঢাকার গাবতলী বা কল্যাণপুর থেকে দিনাজপুরগামী সরাসরি বাস আছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ২০২৬ সালের এপ্রিলের সংশোধিত ভাড়া তালিকা অনুযায়ী গাবতলী থেকে দিনাজপুর নন-এসি বাসে ভাড়া ৯৭৪ টাকা (৫১ সিট) থেকে ১,২৪১ টাকা (৪০ সিট)। এসি কোচে ভাড়া এর চেয়ে বেশি হয়। যাত্রায় সময় লাগে প্রায় সাত থেকে নয় ঘণ্টা, রাতের বাসে গিয়ে সকালে পৌঁছানো সুবিধাজনক। ট্রেনে: ঢাকা থেকে দিনাজপুর রুটে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস ও দ্রুতযান এক্সপ্রেস চলে। পঞ্চগড় এক্সপ্রেসে শোভন চেয়ারের ভাড়া প্রায় ৬৯৫ টাকা আর স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) প্রায় ১,৩৩৪ টাকা। ট্রেনের সময়সূচি ও ভাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইট বা স্টেশন থেকে যাচাই করে নিন, কারণ পরিবর্তন হতে পারে। দিনাজপুর শহর থেকে মন্দির: শহরের বারোমাইল মোড় এলাকা থেকে ভ্যান, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা মোটরবাইকে কান্তনগর যাওয়া যায়। ভাড়া সাধারণত ২০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে, তবে যাত্রার আগে দরদাম করে নিন। মন্দির পর্যন্ত পথে ঢেপা নদী পার হতে হয়, গ্রামের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে যাওয়াটাই এই ভ্রমণের আনন্দের অংশ।
একদিনে কান্তজিউয়ের সঙ্গে আশপাশের দর্শনীয় স্থান মিলিয়ে ভ্রমণসূচি সাজালে সময়ের পূর্ণ সদ্ব্যবহার হয়। সকালে মন্দির ও মিউজিয়াম দেখে দুপুরের খাবার সেরে বিকেলে নয়াবাদ মসজিদ ঘুরে আসুন, এটি কান্তনগর থেকে কাছেই। নয়াবাদ মসজিদের টেরাকোটা অলংকরণেও কান্তজিউয়ের কারিগরদের হাতের ছাপ আছে বলে মনে করা হয়। হাতে আরও সময় থাকলে দিনাজপুরের রামসাগর, ঐতিহাসিক রাজবাড়ি কিংবা স্বপ্নপুরী ঘুরে দেখতে পারেন। শীতকালে দিন ছোট থাকে, তাই সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ুন, বিকেল পাঁচটার মধ্যে মন্দির চত্বরের ঘোরা শেষ করার পরিকল্পনা রাখুন।
খরচের ধারণা
ধর্মীয় স্থান হওয়ায় মূল মন্দিরে প্রবেশে কোনো টিকিট লাগে না, সব ধর্মের দর্শনার্থীই সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রবেশ করতে পারেন। তবে সংলগ্ন সাইট মিউজিয়ামে টিকিট লাগে: বাংলাদেশি দর্শনার্থী ২০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের নাগরিক ১০০ টাকা, অন্য বিদেশি ২০০ টাকা, আর মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থী ৫ টাকা। মিউজিয়াম রবিবার ও সরকারি ছুটির দিন বন্ধ থাকে। ঢাকা থেকে একদিনের ভ্রমণে যাওয়া-আসার বাস বা ট্রেন ভাড়া, দিনাজপুর শহর থেকে মন্দিরে যাতায়াত, খাওয়া-দাওয়া মিলিয়ে জনপ্রতি খরচ পড়তে পারে প্রায় ২,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা। রাত্রিযাপন করলে হোটেল খরচ যোগ হবে। এই অঙ্কগুলো আনুমানিক, মৌসুম, যানবাহন আর দলভেদে বদলায়। ভ্রমণের আগে বাস-ট্রেনের ভাড়া আর মিউজিয়ামের টিকিটের হালনাগাদ তথ্য যাচাই করে নিন।
কোথায় থাকবেন
কান্তনগর গ্রামে পর্যটকদের থাকার মতো ভালো ব্যবস্থা নেই, তাই রাত্রিযাপনের জন্য দিনাজপুর শহরই ভরসা। শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল ও মোটেল আছে, ভাড়া সাধারণত ৮০০ থেকে ৩,০০০ টাকার মধ্যে। রাসমেলা বা সরকারি ছুটির সময় ভিড় বেশি থাকে, তখন আগে থেকে বুকিং করে যাওয়া ভালো। যারা একদিনে ঘুরে ফিরতে চান, তারা সকালে মন্দির দেখে বিকেলের বাস বা ট্রেনে ঢাকার পথে রওনা দিতে পারেন, থাকার ঝামেলা এড়ানো যায়।
কী খাবেন
দিনাজপুর সুগন্ধি কাটারিভোগ চালের জন্য বিখ্যাত, শহরের হোটেলগুলোতে এই চালের ভাতের সঙ্গে মাছ, ভর্তা আর ডাল খেয়ে দেখুন। মন্দির চত্বরের আশপাশে গ্রামের ছোট দোকানে চা, পুরি, সিঙ্গারা আর মিষ্টি পাওয়া যায়। যারা মিষ্টি পছন্দ করেন, দিনাজপুরের স্থানীয় মিষ্টির দোকানগুলোতে রসমালাই বা কালোজাম চেখে দেখতে পারেন। গ্রীষ্মের শুরুতে (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়) গেলে দিনাজপুরের বিখ্যাত লিচুর স্বাদ নেওয়ার সুযোগ মিলতে পারে। সঙ্গে পানির বোতল রাখুন, কারণ মন্দির চত্বরে ঘোরার সময় রোদে তৃষ্ণা লাগে।
যাওয়ার সেরা সময়
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ শীতকাল, কান্তজিউ ভ্রমণের সবচেয়ে আরামদায়ক সময়। এই সময় আকাশ পরিষ্কার থাকে, রোদের তাপ কম, হেঁটে ঘুরতে কষ্ট হয় না। রাসমেলার রঙিন আবহ উপভোগ করতে চাইলে কার্তিক মাসে (অক্টোবর-নভেম্বর) যান, তখন মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্ত-দর্শনার্থীর ভিড়, গান-বাজনা আর মেলার আমেজ থাকে। দিনের মধ্যে সকাল ৮টা থেকে ১০টা আর বিকেল ৩টা থেকে ৫টা ছবি তোলার জন্য সেরা, এই সময় নরম আলোয় টেরাকোটার খোদাই সবচেয়ে সুন্দর ধরা পড়ে। বর্ষায় পথ কাদা হতে পারে, আর চৈত্র-বৈশাখের প্রচণ্ড গরমে দুপুরে ঘোরা কষ্টকর।
টিপস ও সতর্কতা
এটি সক্রিয় ধর্মীয় স্থান, তাই শালীন পোশাক পরুন এবং মন্দিরের নিয়ম মেনে চলুন। টেরাকোটা ফলকগুলো তিন শ বছরের পুরোনো ও ভঙ্গুর, সেগুলোতে হাত দেবেন না বা দেয়ালে কিছু লিখবেন না। মূল চত্বরে জুতা খুলে উঠুন যেখানে নির্দেশ আছে। মিউজিয়াম দেখতে চাইলে রবিবার এড়িয়ে যান, সেদিন বন্ধ থাকে। স্থানীয় গাইড নিলে প্রতিটি ফলকের পেছনের কাহিনি জানতে পারবেন, ভ্রমণ অনেক বেশি অর্থবহ হবে। ভিড়ের সময় মূল্যবান জিনিসপত্র সাবধানে রাখুন। রাসমেলা বা দোলযাত্রার সময় গেলে আগে থেকে যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থা ঠিক করে রাখুন।
বর্ষাকালে গেলে ছাতা বা রেইনকোট নিন, কারণ মন্দির চত্বর খোলা জায়গায়। গরমের দিনে টুপি, সানগ্লাস আর পর্যাপ্ত পানি অপরিহার্য। মন্দির প্রাঙ্গণে প্লাস্টিকের বোতল বা প্যাকেট ফেলে আসবেন না, নির্দিষ্ট ডাস্টবিন ব্যবহার করুন। ছবি তোলার সময় ফ্ল্যাশ ব্যবহারে সতর্ক থাকুন, বিশেষ করে মিউজিয়ামের ভেতরে নিয়ম মেনে চলুন। দল বেঁধে গেলে স্থানীয় যানবাহন রিজার্ভ করা সাশ্রয়ী হয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থস্থান, পূজা-অর্চনার সময় ভক্তদের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে ঘুরুন।
প্রশ্ন: কান্তজিউ মন্দিরে কি প্রবেশ টিকিট লাগে?
উত্তর: না, মূল মন্দিরে প্রবেশে কোনো টিকিট লাগে না। মন্দির প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সব ধর্মের দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। তবে পাশের সাইট মিউজিয়ামে প্রবেশে টিকিট লাগে, বাংলাদেশিদের জন্য ২০ টাকা।
প্রশ্ন: মন্দিরটি কে, কবে নির্মাণ করেন?
উত্তর: দিনাজপুরের মহারাজা প্রাণনাথ ১৭০৪ সালে নির্মাণ শুরু করেন, তার পুত্র রাজা রামনাথ ১৭৫২ সালে কাজ শেষ করেন। মন্দিরের ভিত্তিফলকের সংস্কৃত শিলালিপিতে এই তথ্য লেখা আছে।
প্রশ্ন: রাসমেলা কখন হয়?
উত্তর: প্রতিবছর কার্তিক মাসে (অক্টোবর-নভেম্বর) মন্দির প্রাঙ্গণে মাসব্যাপী রাসমেলা বসে। এটি দেশের অন্যতম প্রধান রাস উৎসব, তখন দেশ-বিদেশ থেকে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী আসেন।
প্রশ্ন: দিনাজপুর শহর থেকে মন্দির কত দূর, কীভাবে যাব?
উত্তর: কান্তনগর দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে। শহরের বারোমাইল এলাকা থেকে ভ্যান, অটোরিকশা বা মোটরবাইকে যাওয়া যায়, ভাড়া ২০০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে, দরদাম করে নিন।
