বিনোদন ঝলক
ভ্রমণ

লালবাগ কেল্লা ভ্রমণ গাইড ২০২৬: ইতিহাস, টিকিট, খরচ ও যাতায়াত

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৭ অক্টোবর ২০২৬8 মিনিটে পড়ুন
লালবাগ কেল্লা ভ্রমণ গাইড ২০২৬: ইতিহাস, টিকিট, খরচ ও যাতায়াত

কেন যাবেন: লালবাগ কেল্লার ইতিহাস

ঢাকার পুরান শহরের লালবাগ এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে মুঘল আমলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লালবাগ কেল্লা। ১৬৭৮ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজম এই দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন। সেই সময় বাংলার সুবাদার ছিলেন এই শাহজাদা। পরবর্তীতে সুবাদার শায়েস্তা খানের আমলেও কেল্লার কাজ এগিয়ে চলে। কিন্তু শায়েস্তা খানের কন্যা পরি বিবির মৃত্যুর পর নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায় এবং কেল্লা চিরকালের মতো অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগের এই অসম্পূর্ণ দুর্গই এখন ঢাকার অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ।

মুঘল স্থাপত্যের নমুনা হিসেবে লালবাগ কেল্লার গুরুত্ব অপরিসীম। লাল বেলে পাথরের তৈরি এই দুর্গে ইসলামি, পারস্য ও বাংলা স্থাপত্যরীতির মেলবন্ধন দেখা যায়। পরি বিবির সমাধিসৌধ, দেওয়ান-ই-আম, হাম্মামখানা আর তিন গম্বুজবিশিষ্ট শাহী মসজিদ মিলে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক কমপ্লেক্স। যারা ঢাকার ৪০০ বছরের ইতিহাস এক জায়গায় অনুভব করতে চান, তাদের জন্য লালবাগ কেল্লা অপরিহার্য গন্তব্য। পরিবার, বন্ধু বা একা ঘোরাঘুরি, সব ধরনের ভ্রমণের জন্যই জায়গাটি উপযুক্ত।

শায়েস্তা খানের আমলে কেল্লার নির্মাণকাজ বেশ এগিয়ে যায়। তার কন্যা পরি বিবির সমাধিসৌধ এই সময়েই তৈরি হয় বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু পরি বিবির মৃত্যুর পর শোকে ভেঙে পড়া শায়েস্তা খান নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। এরপর আর কখনো কেল্লার কাজ শেষ হয়নি। ব্রিটিশ আমলে কেল্লা বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয় এবং পরবর্তীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এটি সংরক্ষিত ও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

কী কী দেখবেন

কেল্লায় প্রবেশ করেই প্রথমে চোখে পড়বে সুবিশাল সবুজ বাগান আর ফোয়ারা। বাগানের মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেলেই দেখা মিলবে পরি বিবির সমাধিসৌধের। চুন, পাথর ও মার্বেলের এই স্থাপত্যটি কেল্লার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। সমাধির ভেতরের কারুকাজ ও বাইরের গম্বুজ মুঘল স্থাপত্যের সূক্ষ্মতার প্রমাণ বহন করে। অনেকেই এখানে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান ছবি তুলে।

এরপর ঘুরে দেখুন দেওয়ান-ই-আম, অর্থাৎ জনসাধারণের দরবার হল। মুঘল আমলে এখানে বসে সুবাদার সাধারণ মানুষের সঙ্গে দেখা করতেন। পাশেই আছে হাম্মামখানা, যেখানে এখন লালবাগ কেল্লা জাদুঘর চালু আছে। জাদুঘরে মুঘল আমলের নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন, অস্ত্রশস্ত্র, মুদ্রা ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিসপত্র সংরক্ষিত আছে। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এই জাদুঘর বাড়তি আনন্দের জায়গা।

কেল্লার ভেতরে আরও আছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ, যা এখনও নামাজের জন্য ব্যবহৃত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব দিকের বিশাল প্রবেশ ফটকটি নিজেই একটি দর্শনীয় স্থাপনা। আর আছে সেই বিখ্যাত গোপন সুড়ঙ্গের কাহিনি। লোকমুখে প্রচলিত আছে, কেল্লার ভেতর থেকে বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত একটি গোপন সুড়ঙ্গ ছিল, যার মুখ এখন বন্ধ। সুড়ঙ্গটি দেখা না গেলেও এর রহস্যময় গল্প দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। পুরো কেল্লা ঘুরে দেখতে সাধারণত দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে।

কেল্লার বাগানটি নিজেই ঘোরার মতো জায়গা। সাজানো ফুলের বাগান, সবুজ ঘাসের মাঠ আর মাঝখানের ফোয়ারা মিলে শহরের কোলাহল থেকে দূরে শান্ত পরিবেশ তৈরি করে। অনেক দর্শনার্থী এখানে বসে বিশ্রাম নেন, পরিবার নিয়ে সুন্দর সময় কাটান। বিকেলের দিকে বাগানে আলো-ছায়ার খেলা ছবি তোলার জন্য দারুণ হয়।

কীভাবে যাবেন

লালবাগ কেল্লা পুরান ঢাকার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বলে যাতায়াত বেশ সহজ। ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে সিএনজি, বাস বা রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে সরাসরি লালবাগ যাওয়া যায়। গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার এলাকা থেকে রিকশায় কেল্লায় পৌঁছানো যায়, ভাড়া প্রায় ২০ থেকে ৫০ টাকা। আজিমপুর থেকে রিকশায় যাওয়াও সহজ ও সাশ্রয়ী।

শাহবাগের বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে কেল্লা দেখতে যাওয়ার জন্য বিশেষ বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা আছে বলে বিভিন্ন ভ্রমণ সূত্রে জানা যায়। এছাড়া গুলিস্তান, শাহবাগ, টিএসসি বা নিউমার্কেট থেকে রিকশায় যাওয়া যায়। নিজের গাড়ি নিয়ে গেলে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা সম্পর্কে আগে থেকে জেনে নেওয়া ভালো। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ভিড় বেশি থাকে, তাই সকালে রওনা দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

খরচের ধারণা

লালবাগ কেল্লায় প্রবেশ টিকিটের দাম বেশ সাশ্রয়ী। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ভ্রমণ সূত্র অনুযায়ী, দেশি দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ ফি প্রায় ৩০ টাকা। ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য প্রায় ২০ টাকা। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য প্রায় ৩০০ টাকা এবং অন্যান্য দেশের পর্যটকদের জন্য প্রায় ৫০০ টাকা টিকিট মূল্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। টিকিটের দাম সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে, তাই ভ্রমণের আগে যাচাই করে নিন।

যাতায়াত খরচ নির্ভর করে আপনি কোথা থেকে যাচ্ছেন তার ওপর। ঢাকার ভেতর থেকে রিকশা বা সিএনজিতে যাওয়া-আসায় প্রায় ১০০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ হতে পারে। কেল্লার ভেতরে খাবারের দোকান সীমিত, তবে বাইরে পুরান ঢাকার খাবারের দোকানে দুপুরের খাবারে জনপ্রতি প্রায় ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ হতে পারে। সব মিলিয়ে একজনের পুরো দিনের ভ্রমণে প্রায় ৩০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে খরচ হওয়ার কথা। ভ্রমণের আগে যাচাই করে নিন।

পরিবার নিয়ে গেলে খরচের হিসাব আগেই করে নিন। চারজনের পরিবারের জন্য টিকিটে খরচ হবে প্রায় ১২০ টাকা। যাতায়াত ও খাবার মিলিয়ে পুরো দিনের বাজেট প্রায় ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে রাখা যায়। স্কুল-কলেজের শিক্ষা সফরের জন্য লালবাগ কেল্লা খুবই জনপ্রিয়, কারণ কম খরচে ইতিহাস শেখার সুযোগ মেলে।

কোথায় থাকবেন

লালবাগ কেল্লা দিনের ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত, তাই থাকার দরকার সাধারণত পড়ে না। তবে ঢাকার বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের জন্য পুরান ঢাকা ও আশপাশে বিভিন্ন মানের হোটেল আছে। আজিমপুর, লালবাগ ও বংশাল এলাকায় বাজেট হোটেলে রাতপ্রতি প্রায় ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকায় থাকা যায়। মাঝারি মানের হোটেলে খরচ প্রায় ২০০০ থেকে ৪০০০ টাকা।

আরও ভালো মানের থাকার ব্যবস্থা চাইলে শাহবাগ, পল্টন বা মতিঝিল এলাকার হোটেল বেছে নেওয়া যায়, সেখান থেকে কেল্লায় যাতায়াত সহজ। অনলাইনে বুকিং দেওয়ার আগে রিভিউ দেখে নেওয়া ভালো। ভ্রমণ মৌসুমে আগেই বুকিং দিয়ে রাখলে সুবিধা হয়।

কী খাবেন

লালবাগ কেল্লা ঘোরার পর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ না নিলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কেল্লার আশপাশে ও লালবাগ এলাকায় পুরান ঢাকার বিখ্যাত কাচ্চি, মোরগ পোলাও, তেহারি ও বিরিয়ানির দোকান আছে। মিষ্টিপ্রেমীদের জন্য আছে ঐতিহ্যবাহী ফিরনি, জর্দা ও নানা ধরনের মিষ্টি।

শীতকালে গেলে পুরান ঢাকার পিঠা ও গরম গরম চায়ের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। বোরহানি ও লাচ্ছি এখানকার জনপ্রিয় পানীয়। খাবারের দোকান বাছাইয়ের সময় ভিড় দেখে দোকান বেছে নিন, যেখানে স্থানীয় মানুষ বেশি খায় সেখানকার খাবার সাধারণত ভালো হয়। পানির বোতল সঙ্গে রাখুন, বিশেষ করে গরমের দিনে।

যাওয়ার সেরা সময়

লালবাগ কেল্লা ভ্রমণের সেরা সময় শীতকাল, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মার্চ। এই সময় আবহাওয়া শীতল ও আরামদায়ক থাকে, ফলে খোলা জায়গায় ঘুরে বেড়াতে সুবিধা হয়। গ্রীষ্মকালে দুপুরের রোদে কেল্লা ঘোরা কষ্টকর হতে পারে, তাই গরমের দিনে গেলে সকালের দিকে যাওয়াই ভালো।

সময়সূচির দিক থেকে মনে রাখুন, রবিবার কেল্লা পূর্ণদিবস বন্ধ থাকে এবং সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে সাধারণত সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে, তবে শীতকালে সময় কিছুটা কমে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা হতে পারে। শুক্রবার দুপুরে নামাজের বিরতি থাকতে পারে। সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকার সম্ভাবনা থাকে, তাই যাওয়ার আগে সময়সূচি যাচাই করে নিন।

টিপস ও সতর্কতা

কেল্লায় ঘোরার সময় আরামদায়ক জুতা পরুন, কারণ অনেকটা পথ হেঁটে ঘুরতে হবে। রোদ থেকে বাঁচতে টুপি বা ছাতা এবং সানস্ক্রিন সঙ্গে রাখুন। ক্যামেরা বা মোবাইলে ছবি তোলা যায়, তবে জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলার নিয়ম মেনে চলুন। মূল্যবান জিনিসপত্র সাবধানে রাখুন, ভিড়ের মধ্যে পকেটমার থেকে সতর্ক থাকুন।

বর্ষাকালে গেলে ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন, কারণ কেল্লার বেশিরভাগ এলাকা খোলা আকাশের নিচে। ভেতরে পানির বোতল কিনতে পাওয়া গেলেও দাম বেশি হতে পারে, তাই বাইরে থেকে পানি নিয়ে যাওয়া ভালো। সকালের দিকে গেলে ভিড় কম থাকে এবং জাদুঘর ভালোভাবে দেখা যায়।

ঐতিহাসিক স্থাপনার গায়ে লেখা বা দাগ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। বাগান ও চত্বর পরিষ্কার রাখুন, ময়লা নির্ধারিত জায়গায় ফেলুন। শিশুদের সঙ্গে গেলে তাদের চোখে চোখে রাখুন, বিশেষ করে পুকুর বা উঁচু স্থাপনার কাছে। গাইড নিতে চাইলে কেল্লার ভেতরে বা গেটের কাছে স্থানীয় গাইড পাওয়া যায়, দরদাম করে নিন।

FAQ

প্রশ্ন: লালবাগ কেল্লা সপ্তাহে কোন দিন বন্ধ থাকে? উত্তর: রবিবার পূর্ণদিবস বন্ধ থাকে এবং সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে। সোমবার সাধারণত দুপুরের পর থেকে খোলা থাকে। সরকারি ছুটির দিনেও বন্ধ থাকতে পারে।

প্রশ্ন: লালবাগ কেল্লার প্রবেশ টিকিটের দাম কত? উত্তর: সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী দেশি দর্শনার্থীদের জন্য প্রায় ৩০ টাকা, শিশুদের জন্য প্রায় ২০ টাকা। বিদেশি পর্যটকদের জন্য বেশি, প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। ভ্রমণের আগে যাচাই করে নিন।

প্রশ্ন: কেল্লা ঘুরে দেখতে কত সময় লাগে? উত্তর: পুরো কেল্লা, জাদুঘর ও বাগান ভালোভাবে ঘুরে দেখতে সাধারণত দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। ছবি তুলতে ও বিশ্রাম নিতে চাইলে আরও কিছুটা সময় হাতে রাখুন।

প্রশ্ন: লালবাগ কেল্লার গোপন সুড়ঙ্গ কি দেখা যায়? উত্তর: সুড়ঙ্গের মুখ এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তাই ভেতরে ঢোকা যায় না। তবে এর রহস্যময় ইতিহাস ও লোককথা গাইডদের কাছ থেকে শুনতে পারবেন।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার