বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল। মৌলভীবাজার জেলার এই ছোট্ট শহর ঘিরে আছে মাইলের পর মাইল সবুজ চা বাগান, ঘন অরণ্য, শান্ত লেক আর আদিবাসী জনপদ। ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ, অথচ পৌঁছানোর পর মনে হয় অন্য এক জগতে চলে এসেছেন। চা বাগানের মাঝ দিয়ে হাঁটা, মাধবপুর লেকের পাড়ে বসে থাকা, লাউয়াছড়ার বনে উল্লুকের ডাক শোনা আর নীলকণ্ঠের সাতরং চায়ের চুমুক, সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গল একদিন বা দুইদিনের ভ্রমণের জন্য দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোর একটি।
কেন যাবেন
শ্রীমঙ্গল যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ এর চা বাগান। সারি সারি চা গাছের সবুজ ঢেউ, বাগানের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া পিচঢালা পথ আর ভোরের কুয়াশায় ঢাকা টিলা, এই দৃশ্য বাংলাদেশের আর কোথাও এভাবে পাওয়া যায় না। চা বাগানে হাঁটতে কোনো টিকিট লাগে না, অনেক বাগানেই পর্যটকরা স্বচ্ছন্দে ঘুরতে পারেন। এর বাইরে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ঘন বন, মাধবপুর লেকের নীল পানি আর শাপলা, হামহাম ঝর্ণার রোমাঞ্চ মিলে শ্রীমঙ্গলে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য সবকিছুই আছে। যারা এক ট্রিপে বন, লেক, ঝর্ণা আর চা বাগান একসঙ্গে দেখতে চান, তাদের জন্য শ্রীমঙ্গলের বিকল্প কম।
কী কী দেখবেন
চা বাগান: শ্রীমঙ্গলের প্রাণ। ফিনলে টি এস্টেট, নূরজাহান টি এস্টেটসহ বড় বড় বাগানগুলোতে সকাল বা বিকেলে হাঁটুন। চা শ্রমিকদের পাতা তোলার দৃশ্য, বাগানের ভেতরের ছোট ছোট টিলা আর সবুজের সমারোহ মন ভরিয়ে দেবে। মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চা তোলার মৌসুমে শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা দেখা যায়।
মাধবপুর লেক: মাধবপুর চা বাগানের ভেতরে পাহাড়ের কোলে এই লেক। নীল পানি, চারপাশে ছোট ছোট টিলা আর পানিতে ভাসা শাপলা মিলে জায়গাটি অসম্ভব শান্ত। বিকেল কাটানোর জন্য আদর্শ। প্রবেশে সামান্য টিকিট লাগে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান: শ্রীমঙ্গল থেকে অল্প দূরত্বে এই সংরক্ষিত বন। বিপন্ন উল্লুক, হনুমান, বানর আর নানা প্রজাতির পাখির আবাস। বনের ভেতরে তিনটি হাঁটা পথ আছে, গাইড নিয়ে ঘুরলে বন্যপ্রাণী দেখার সম্ভাবনা বাড়ে।
নীলকণ্ঠ টি কেবিনের সাতরং চা: শ্রীমঙ্গল শহরের এই ঐতিহ্যবাহী দোকানে পাওয়া যায় বিখ্যাত সাত স্তরের চা। এক গ্লাসে সাত রঙের চা কীভাবে আলাদা থাকে, তা দেখাই এক মজার অভিজ্ঞতা। দামও হাতের নাগালে।
বাইক্কা বিল ও হামহাম ঝর্ণা: পাখি দেখতে চাইলে বাইক্কা বিল, আর ট্রেকিংয়ের নেশা থাকলে হামহাম ঝর্ণা। হামহামে যেতে পাহাড়ি পথে হাঁটতে হয়, সঙ্গে স্থানীয় গাইড নেওয়া ভালো। এছাড়া রাবার বাগান, লাল পাহাড়, সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা আর মণিপুরি ও খাসিয়া পাড়া ঘুরে দেখা যায়।
কীভাবে যাবেন
বাসে ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল: ফকিরাপুল, মহাখালী বা সায়েদাবাদ থেকে শ্রীমঙ্গলগামী বাস পাওয়া যায়। বাস কোম্পানি ও এসি নন এসি ভেদে জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ৪৭০ থেকে ৬০০ টাকা। রাতের বাসে গেলে ভোরে শ্রীমঙ্গল পৌঁছে সারাদিন ঘোরা যায়।
ট্রেনে ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল: কমলাপুর বা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে শ্রীমঙ্গলগামী ট্রেনে যাওয়া সবচেয়ে আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী উপায়। শ্রেণীভেদে ভাড়া ২৪০ থেকে ৮২৮ টাকা পর্যন্ত। সকালের ট্রেনে গেলে দুপুরের আগেই পৌঁছে যাওয়া যায়। ছুটির দিনে টিকিটের চাপ থাকে, তাই আগে কাটুন।
চট্টগ্রাম থেকে শ্রীমঙ্গল: চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী বাসে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। এসি বাসে ভাড়া ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা, নন এসিতে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনেও আসা যায়, ভাড়া শ্রেণীভেদে ৩৭৫ থেকে ১৩৩৮ টাকা।
শ্রীমঙ্গলে ঘোরাঘুরি: শহরে নেমে সারাদিনের জন্য সিএনজি, অটোরিকশা বা চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করে নিন। চান্দের গাড়ি বা জিপে সারাদিন ঘুরতে খরচ পড়ে প্রায় ৩৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা, দলে ভাগ করে নিলে জনপ্রতি কমে। লাউয়াছড়া যেতে সিএনজি রিজার্ভে যাওয়া আসা মিলিয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাগে।
খরচের ধারণা
শ্রীমঙ্গল বাজেটবান্ধব গন্তব্য। দিনভ্রমণে ট্রেনে যাওয়া আসা, লোকাল যানবাহন, খাবার ও টিকিট মিলিয়ে জনপ্রতি খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এক রাত থেকে দুই দিন ঘুরতে চাইলে থাকা যোগ হবে। মাধবপুর লেকে প্রবেশ টিকিট সামান্য, লাউয়াছড়ায় প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিট ৫০ থেকে ১১৫ টাকা। সাতরং চায়ের দাম ১০০ টাকার কম। ভ্রমণের আগে যানবাহন ও হোটেলের ভাড়া যাচাই করে নিন, কারণ মৌসুম ও ছুটির দিনে দাম ওঠানামা করে।
কোথায় থাকবেন
শ্রীমঙ্গলে সব বাজেটের থাকার ব্যবস্থা আছে। শহরে সাধারণ হোটেল ও গেস্ট হাউস, আর চা বাগান ঘেঁষা এলাকায় কটেজ ও রিসোর্ট। বাগানের পাশে বাংলো ধাঁচের কটেজে ৪ থেকে ৮ জন থাকা যায়, ভাড়া প্রতি রাতে ৫০০০ থেকে ৮০০০ টাকা। মাঝারি মানের হোটেলে ভাড়া ২০০০ থেকে ১০০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে প্রতিষ্ঠানভেদে। ছুটির দিনে আগে বুকিং দেওয়া ভালো। লাউয়াছড়ার বন রেস্ট হাউসে থাকতে চাইলে বন বিভাগের অনুমতি লাগে।
কী খাবেন
শ্রীমঙ্গলের খাবারে চায়ের ছোঁয়া থাকবেই। নীলকণ্ঠ টি কেবিনের সাতরং চা ছাড়াও বাগানের তাজা চা পাতার চা চেখে দেখুন। স্থানীয় হোটেলগুলোতে ভাত, মাছ, মুরগি ও ডালের বাঙালি খাবার পাওয়া যায়, দুপুরের খাবারে খরচ পড়ে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। মণিপুরি পাড়ায় তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়। শহরের বাজারে চা পাতা, আনারস, লেবু আর মধু কিনতে পারেন।
যাওয়ার সেরা সময়
শ্রীমঙ্গল যাওয়ার সেরা সময় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময় আবহাওয়া শুষ্ক ও আরামদায়ক, চা বাগান থাকে সবচেয়ে সবুজ। শীতকালে লাউয়াছড়ায় পর্যটকের ভিড় বেশি থাকে। চা শ্রমিকদের পাতা তোলার দৃশ্য দেখতে চাইলে মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে যান। বর্ষায় বাগান আরও সবুজ হয়, তবে পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল থাকে।
টিপস ও সতর্কতা
চা বাগানে ঘোরার সময় গাছের ক্ষতি করবেন না, পাতা ছিঁড়বেন না। লাউয়াছড়ার বনে জোরে কথা বলা বা চিৎকার করা থেকে বিরত থাকুন, এতে বন্যপ্রাণী ভয় পায়। প্লাস্টিকের বোতল বা আবর্জনা বনে ফেলবেন না। হামহাম ঝর্ণায় যেতে ভালো গ্রিপের জুতা পরুন, বর্ষায় পথ পিচ্ছিল থাকে। রেললাইনে ছবি তোলার সময় ট্রেনের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। আদিবাসী পাড়ায় গেলে তাদের জীবনযাত্রার প্রতি সম্মান দেখান, অনুমতি ছাড়া ছবি তুলবেন না।
দুই দিনের স্যাম্পল পরিকল্পনা
দুই দিন থাকলে শ্রীমঙ্গল আরামে ঘোরা যায়। প্রথম দিন সকালে চা বাগানে হাঁটুন, দুপুরে মাধবপুর লেক দেখে বিকেলে নীলকণ্ঠে সাতরং চা খান। দ্বিতীয় দিন ভোরে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যান, কারণ সকালে পাখি ও উল্লুক দেখার সম্ভাবনা বেশি থাকে। দুপুরের পর হামহাম ঝর্ণা বা বাইক্কা বিলে যেতে পারেন। সন্ধ্যায় শহরের বাজারে কেনাকাটা সেরে রাতের ট্রেন বা বাসে ফেরা যায়।
খাঁটি চা পাতা কেনা
শ্রীমঙ্গল থেকে ফেরার সময় চা পাতা না কিনলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ। শহরের বাজারে অনেক দোকানে খাঁটি চা পাতা পাওয়া যায়, তবে দাম ও মান যাচাই করে কিনুন। বাগানের আশেপাশের দোকান থেকে তাজা পাতার চা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। গ্রিন টি, অর্থোডক্স চা আর সাধারণ কালো চা, পছন্দমতো বেছে নিন। উপহার হিসেবে ছোট প্যাকেটের চা ভালো স্মৃতি হতে পারে।
স্থানীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া
শ্রীমঙ্গলের আশেপাশে মণিপুরি ও খাসিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস। মণিপুরিদের হাতে বোনা কাপড় ও ঐতিহ্যবাহী খাবার বেশ জনপ্রিয়। খাসিয়ারা পাহাড়ে পান চাষ করেন, তাদের পুঞ্জিতে গেলে পান বাগান দেখা যায়। রাস পূর্ণিমার সময় মণিপুরিদের রাস উৎসব দেখার সুযোগ মিললে তা হবে বাড়তি পাওনা। আদিবাসী পাড়ায় গেলে তাদের জীবনযাত্রার প্রতি সম্মান দেখান, অনুমতি ছাড়া ছবি তুলবেন না।
ভিড় এড়াতে চাইলে
শীতকাল ও সরকারি ছুটির দিনে শ্রীমঙ্গলে পর্যটকের ভিড় বেশি থাকে, তখন হোটেল ভাড়াও বাড়ে। নিরিবিলিতে ঘুরতে চাইলে সপ্তাহের মাঝামাঝি দিন বেছে নিন। লাউয়াছড়ায় সকাল ৮টার আগে পৌঁছালে ভিড় কম পাবেন আর বন্যপ্রাণী দেখার সম্ভাবনাও বেশি। মাধবপুর লেকে বিকেলের দিকে আলো ছবির জন্য সুন্দর, তবে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসুন।
চা কারখানা দেখার সুযোগ
কোনো কোনো চা বাগানে চা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ঘুরে দেখার সুযোগ মেলে। পাতা তোলা থেকে শুরু করে শুকানো, গুঁড়ো করা ও প্যাকেজিং পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া দেখা বেশ শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। কারখানায় ঢুকতে চাইলে আগে বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিন, কারণ সব কারখানায় পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি থাকে না।
বর্ষায় অন্য রূপ
বর্ষাকালে শ্রীমঙ্গলের চা বাগান আরও গাঢ় সবুজ হয়ে ওঠে, বৃষ্টিভেজা পাতায় আলো পড়লে দৃশ্য হয় মনোমুগ্ধকর। তবে এই সময় পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল থাকে, হামহাম ঝর্ণার পথে স্রোতও বাড়ে। বর্ষায় গেলে ছাতা বা রেইনকোট সঙ্গে রাখুন, আর জোঁকের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: একদিনে কি শ্রীমঙ্গল ঘোরা সম্ভব? উত্তর: সম্ভব। ভোরে পৌঁছে চা বাগান, মাধবপুর লেক, লাউয়াছড়া ও সাতরং চা একদিনে দেখা যায়। তবে দুই দিন থাকলে হামহাম ঝর্ণা ও বাইক্কা বিলসহ আরামে ঘোরা যায়।
প্রশ্ন: সাতরং চা কোথায় পাওয়া যায়? উত্তর: শ্রীমঙ্গল শহরের নীলকণ্ঠ টি কেবিনে আসল সাত স্তরের চা পাওয়া যায়। দাম ১০০ টাকার কম।
প্রশ্ন: চা বাগানে ঢুকতে কি টিকিট লাগে? উত্তর: বেশিরভাগ চা বাগানে হাঁটতে টিকিট লাগে না। তবে বাগানের নিয়ম মেনে চলুন, নির্ধারিত পথে হাঁটুন।
প্রশ্ন: শ্রীমঙ্গলে থাকার খরচ কেমন? উত্তর: বাজেট হোটেল থেকে বিলাসবহুল রিসোর্ট সবই আছে। মাঝারি হোটেলে প্রতি রাতে ২০০০ থেকে ৫০০০ টাকা, বাগানঘেঁষা কটেজে ৫০০০ থেকে ৮০০০ টাকা লাগতে পারে।
