রোববার সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও তোলপাড় থামেনি। অভিনেতা নিজে অক্ষত থাকলেও গুলিতে আহত হয়েছেন তাঁর গাড়িচালক ও আরও একজন। তিন সন্দেহভাজন গ্রেফতার হয়েছে, তদন্তে নেমেছে পুলিশের একাধিক বিশেষ দল। আর এই পুরো ঘটনার ছায়া হয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটাই নাম: লরেন্স বিষ্ণোই। কারাগারের ভেতরে থাকা এই ব্যক্তি কীভাবে বলিউডের আতঙ্কের নাম হয়ে উঠলেন, সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছেন সবাই।
ঘটনার সূত্রপাত রোববার সন্ধ্যায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রতি রোববার মুম্বাইয়ের জুহু এলাকার একটি ফুটবল মাঠে যেতেন টাইগার শ্রফ। সেদিনও খেলা শেষে গাড়িতে করে বাড়ি ফেরার সময় বাইকে আসা দুষ্কৃতীরা তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। হামলার পর অভিযুক্তরা এসভি রোড ধরে ভিলে পার্লে ও আন্ধেরির দিকে পালিয়ে যায়। পরে আন্ধেরি ওয়েস্ট রেলস্টেশনের কাছে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ফেলে রেখে তারা ট্রেনে ওঠে। শেষ পর্যন্ত রাজস্থানের কোটা রেলস্টেশনে পুনে-জয়পুর এক্সপ্রেস ট্রেন থেকে তিনজনকে আটক করে পুলিশ।
গ্রেফতার তিনজনের পরিচয়ও এখন প্রকাশ্য। সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, তারা হলেন হরিয়ানার সোনিপতের ১৭ বছর বয়সী ফুল সিং, সোনিপতেরই ১৮ বছর বয়সী রেহান এবং বিহারের বেগুসরাইয়ের ২২ বছর বয়সী হৃতিক কুমার ওরফে রোশন। হৃতিক মুম্বাইয়ের আন্ধেরি ওয়েস্টে থেকে র্যাপিডো চালক হিসেবে কাজ করতেন। রাজস্থান অ্যান্টি-গ্যাংস্টার টাস্কফোর্স ও কোটা সিটি পুলিশের যৌথ দল মুম্বাই পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে। পুলিশের দাবি, দুজন ভাড়াটে হামলাকারী এবং তৃতীয়জন তাদের পালাতে সহায়তা করেছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, হামলার আগে থেকেই টাইগারের চলাফেরার ওপর নজর রাখছিল অভিযুক্তরা।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি বার্তা, যেখানে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে দাবি করা হয়। বার্তাটিতে অনিল পণ্ডিত ও হারমান সান্ধু নামে দুই ব্যক্তি নিজেদের গ্যাংটির সদস্য পরিচয় দেন। সেখানে দাবি করা হয়, ঘটনার আগে টাইগারকে ফোন করে সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি গুরুত্ব দেননি। একই বার্তায় হিন্দি চলচ্চিত্রশিল্পের অন্যদেরও হুমকি দেওয়া হয়: যারা তাদের কথা না মেনে সালমান খানের সঙ্গে কাজ করবে, তাদের মরতে হবে, সবারই টাইগার শ্রফের মতো পরিণতি হবে। তবে এই বার্তার সত্যতা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ, এবং এই হামলায় লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সরাসরি নির্দেশের প্রমাণও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ দায়-দাবি আছে, কিন্তু যাচাই এখনো বাকি।
তাহলে কে এই লরেন্স বিষ্ণোই, যার নামেই কাঁপছে বলিউড? ১৯৯৩ সালে ভারতের পাঞ্জাবে জন্ম তাঁর। আবোহার এলাকায় শৈশব কাটিয়ে পড়াশোনার জন্য তিনি যান চণ্ডীগড়ে। ডিএভি কলেজে পড়ার সময় জড়িয়ে পড়েন ছাত্ররাজনীতিতে। সেখানেই গোল্ডি ব্রারের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ছাত্ররাজনীতির সংঘাত থেকে ধীরে ধীরে তাঁর নাম জড়িয়ে পড়ে হামলা, হত্যাচেষ্টা ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলায়। এভাবেই কলেজ ক্যাম্পাসের রাজনীতি থেকে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের অপরাধজগতের আলোচিত নাম।
বিষ্ণোইয়ের নাম বলিউডে আতঙ্কের কারণ, তারকারা এখন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। টাইগার-হামলার পর সালমান খানসহ একাধিক তারকার নিরাপত্তা জোরদার করেছে মুম্বাই পুলিশ। ঘটনার পর মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় টাইগার শ্রফের বাসায় গিয়ে তাঁর খোঁজখবর নেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। মুম্বাইয়ে গ্যাং-সহিংসতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, এর জবাব দেওয়া হবে পাল্টা জবাবে।
এখন সব নজর তদন্তের দিকে। হামলার পেছনে কারা জড়িত, তা শনাক্ত করতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও সন্দেহভাজনদের শনাক্তে ১২টি বিশেষ দল মোতায়েন করেছে মুম্বাই পুলিশ। গ্রেফতার তিনজনের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসতে পারে চক্রের জাল কতদূর বিস্তৃত। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কারাগারে থেকেও কীভাবে একটি চক্রের নামে এমন হামলার দায়-দাবি আসে। সেই প্রশ্নের উত্তর না মেলা পর্যন্ত বলিউডের এই আতঙ্কের অধ্যায় শেষ হচ্ছে না।
