ঢাকায় ফিরছে প্রামাণ্যচিত্রপ্রেমীদের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত উৎসব। ২৯ অক্টোবর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রামাণ্য চলচ্চিত্র উৎসব ‘লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ’-এর ১৩তম আসরের পর্দা উঠছে। উৎসব চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। প্রতিযোগিতা বিভাগ (জাতীয় ও আন্তর্জাতিক) ও ‘বেস্ট অব দ্য ফেস্ট’ বিভাগে নির্বাচিত ১৭টি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র দেখানো হবে এবারের আসরে। প্রথম আলোর ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের উৎসবের প্রতিপাদ্য ‘প্রেজেন্স ইন অ্যাবসেন্স’।
সংখ্যাগুলো বলছে উৎসবের পরিধি কতটা বড় হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এবার চলচ্চিত্র জমা পড়েছিল ১৮৮টি। সেখান থেকে প্রদর্শনীর জন্য ১৭টি বেছে নিয়েছে ৮ সদস্যের প্রিভিউ কমিটি। কমিটির সদস্য ছিলেন জিহান করিম, বিপ্লব সরকার, মেহেদী মোস্তফা, পার্থ সারথী, শারমিন দোজা, চৈতালী সমাদ্দার, কামরুল আহসান ও কাজী আরেফিন আহমেদ। ১৮৮ থেকে ১৭, এই কঠোর বাছাই প্রক্রিয়া নিজেই বলে দেয়, পর্দায় ওঠা প্রতিটি ছবিই মানের কঠিন পরীক্ষা পেরিয়ে এসেছে।
নির্বাচিত চলচ্চিত্রগুলো সাজানো হয়েছে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বিভাগে। এর মধ্যে রয়েছে ‘বডিজ অ্যান্ড বিলংগিং’, ‘জেন্ডার ইকুয়ালিটি অ্যান্ড রেজিস্ট্যান্স’, ‘রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড রিফর্ম’, ‘জেনারেশনাল মেমোরি’, ‘ডিসপ্লেসমেন্ট অ্যান্ড স্টেটলেসনেস’, ‘১৯৭১: লিভিং আর্কাইভস’, ‘ইকোলজি ইন ক্রাইসিস’ এবং ‘অ্যানচেস্ট্রাল রুটস অ্যান্ড লাইভলিহুডস’। বিভাগগুলোর নাম থেকেই বোঝা যায়, এবারের উৎসব শরীর ও পরিচয়, লিঙ্গ-সমতা, প্রতিরোধ, প্রজন্মের স্মৃতি, বাস্তুচ্যুতি, ১৯৭১-এর জীবন্ত সংরক্ষণাগার, জলবায়ু-সংকট ও আদিবাসী জীবিকার মতো গভীর বিষয়গুলোকে ছুঁয়ে যাবে।
পুরস্কারের কাঠামোটাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিযোগিতা বিভাগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক, দুই ক্যাটাগরিতে একটি করে চলচ্চিত্র পুরস্কার পাবে। প্রতিটি পুরস্কারের অর্থমূল্য এক লাখ টাকা। এ ছাড়া তরুণদের দৃষ্টিতে সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচন করতে গঠন করা হয়েছে নয় সদস্যের ইয়ুথ জুরি কমিটি। বিজয়ী চলচ্চিত্রকে দেওয়া হবে ক্রেস্ট ও সনদ। জুরি প্যানেলেও আছেন পরিচিত মুখ। জাতীয় প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরি হিসেবে থাকছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা শবনম ফেরদৌসী, দৃশ্যশিল্পী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা দিলারা বেগম এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের শিক্ষক সাজ্জাদ হোসেন। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগের জুরি কমিটিতে রয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা শামীম আখতার ও মানবাধিকারকর্মী আসিফ মুনীর।
উৎসবের লক্ষ্য নিয়ে আয়োজকদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মুক্তি ও মানবাধিকারবিষয়ক চলচ্চিত্রচর্চার প্রসার, আন্তর্জাতিক প্রামাণ্যচিত্রের সঙ্গে দেশীয় নির্মাতাদের সংযোগ তৈরি এবং নতুন প্রজন্মকে এ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহিত করার লক্ষ্য নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে উৎসবটি। তরুণদের সম্পৃক্ত করতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫ জন শিক্ষার্থীকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে, যা উৎসবের ভবিষ্যৎ দর্শক ও নির্মাতা তৈরির দিকেই ইঙ্গিত করে।
শুধু চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এবারের আসর। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সংযোগ তৈরিতে থাকছে বিশেষ সেমিনার। উচ্চশিক্ষায় শ্রেণিকক্ষের অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা হবে এতে। উৎসবের দ্বিতীয় দিন ৩০ অক্টোবর বিকেল চারটায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সেমিনারকক্ষে অনুষ্ঠিত হবে সেমিনারটি। অর্থাৎ, উৎসবটি শুধু দেখার নয়, শেখার ও ভাবনার জায়গাও তৈরি করতে চাইছে।
এই উৎসবের শেকড়টা বেশ পুরনো। সেলুলয়েডে বিশ্বের মানুষের মুক্তি ও মানবাধিকার রক্ষার সংগ্রাম তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করে লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ। প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই উৎসব বাংলাদেশে প্রামাণ্যচিত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মঞ্চ হয়ে উঠেছে। বাণিজ্যিক সিনেমার ভিড়ে প্রামাণ্যচিত্র যেখানে প্রায়ই প্রান্তিক থাকে, সেখানে এই উৎসব বছরের পর বছর ধরে এই ধারার নির্মাতা ও দর্শকদের এক ছাদের নিচে আনছে।
কেন এই খবর গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অবস্থানেই লুকিয়ে। প্রামাণ্যচিত্রের বড় একটি অংশই ইতিহাস, স্মৃতি ও সত্যের দলিল। ‘১৯৭১: লিভিং আর্কাইভস’-এর মতো বিভাগ যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রাঙ্গণে দেখানো হয়, তখন স্থান ও বিষয় একে অপরকে পূর্ণতা দেয়। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার যে চ্যালেঞ্জ, প্রামাণ্যচিত্র সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমগুলোর একটি।
দর্শকদের জন্য পরের ধাপটা সহজ। ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর, আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ১৭টি নির্বাচিত ছবি, আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নির্মাতাদের উপস্থিতি, আর ৩০ অক্টোবরের সেমিনার। প্রামাণ্যচিত্রে আগ্রহী যে কারও জন্য এই তিন দিন হতে পারে বছরের সবচেয়ে মূল্যবান সিনেমা-অভিজ্ঞতা।
