বাংলাদেশের বেসরকারি টেলিভিশন মাছরাঙা টিভির ভেরিফায়েড ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার ঘটনা নিয়ে দুই দিন ধরে তোলপাড় চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক বিবৃতি অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর ভোররাতে অ্যাকাউন্টটি হ্যাক করে সেখানে পাঁচটি আপত্তিকর ভিডিও প্রকাশ করা হয়, যার দুটিতে দুই বাংলাদেশি অভিনেত্রীর মুখ বসানো ছিল। ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার ও মামলা করার কথা জানিয়েছে। আর ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে ভিডিওগুলো ফেস-সোয়াপ প্রযুক্তিতে সম্পাদিত বলে প্রমাণিত হয়েছে। তবে হ্যাকের দাবি ও তার পরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
ঘটনা সামনে আসে ১৩ অক্টোবর সকালে। সেদিন ফেসবুকে একাধিক ব্যবহারকারী মাছরাঙা টিভির ইনস্টাগ্রাম ফিডের স্ক্রিনশট পোস্ট করে জানতে চান, প্রোফাইলটি হ্যাক হয়েছে কিনা। প্রোফাইলে গিয়ে দেখা যায়, আগের রাতে সেখানে আপত্তিকর দৃশ্যসংবলিত পাঁচটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ভিডিওতে অভিনেত্রী মেহজাবিন চৌধুরী ও নায়িকা পরী মণির সদৃশ নারীকে দেখা যায়। ভিডিওগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সেদিন বিকেল নাগাদ শুধু এই দুই ভিডিওই প্রায় চার লাখ বার দেখা হয়েছিল।
রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আলোচিত দুই ভিডিও আসলে সম্পাদিত। ভিডিও দুটির মূল সংস্করণ একাধিক প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্টের সাইটে খুঁজে পাওয়া গেছে, যেখানে ওই দুই নারী তারকার কাউকেই দেখা যায়নি। মূলত ফেস-সোয়াপ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিডিওগুলোতে দুই তারকার মুখ বসিয়ে এগুলো বানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, সম্পাদিত এই ভিডিওগুলো আগেও বিভিন্ন প্রাপ্তবয়স্ক সাইটে আপলোড হয়েছিল। পাঠকের নিরাপত্তার কথা ভেবে রিউমর স্ক্যানার সেসব সাইটের হাইপারলিংক প্রতিবেদনে দেয়নি।
ঘটনার ধারাবাহিকতা এমন: ১২ অক্টোবর রাতে (বিবৃতি অনুযায়ী ১৩ অক্টোবর ভোররাতে) হ্যাক ও ভিডিও আপলোড; ১৩ অক্টোবর সকালে ফেসবুকে স্ক্রিনশট ভাইরাল; সকালেই মাছরাঙা টিভির মাল্টিমিডিয়া ম্যানেজার মাহমুদ রুবেল ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্টকে জানান, তাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে এবং মামলার প্রস্তুতি চলছে; ওইদিনই প্রোফাইলে আরও ১৭টি নিউজ কনটেন্ট পোস্ট হয়, যার বেশিরভাগই গত ৮ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রকাশিত পুরনো কনটেন্ট; বিকেল ৫টার পর আলোচিত ভিডিওগুলো প্রোফাইল থেকে সরে যায়; সন্ধ্যায় আসে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি; আর ১৪ অক্টোবর রিউমর স্ক্যানার কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পেয়ে প্রতিবেদন সংশোধন করে।
হ্যাকের দাবির পরও প্রোফাইলে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। রিউমর স্ক্যানারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মাহমুদ রুবেল জানিয়েছেন, এ ঘটনায় তারা মামলা করেছেন। তার ভাষ্যমতে, হ্যাকিং শনাক্ত করার সময় প্রোফাইলে ১২-১৩টি আপত্তিকর ভিডিও দেখতে পান তারা। মাছরাঙা টিভির ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল তাদের ফেসবুক পেজের সঙ্গে সংযুক্ত, ফলে ইনস্টাগ্রামে আলাদাভাবে পোস্ট না করে ফেসবুকে প্রকাশিত কনটেন্ট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইনস্টাগ্রামেও প্রকাশিত হয়। এই সংযোগ কাজে লাগিয়ে ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ভিডিওগুলো সরানোর চেষ্টা করা হয়। এতে অধিকাংশ ভিডিও সরানো গেলেও আলোচিত পাঁচটি সরানো যায়নি। রুবেলের দাবি, হ্যাকাররা ওই পাঁচটি ভিডিও বুস্ট করে বিজ্ঞাপন চালাচ্ছিল, সেগুলো সরাতে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপকের (অ্যাড ম্যানেজার) সহায়তা দরকার ছিল। কিন্তু সেদিন ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলের পাশাপাশি অ্যাড ম্যানেজারও তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় ভিডিওগুলো সরানো সম্ভব হয়নি। অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর ভিডিওগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। আর সেদিন প্রকাশিত সংবাদ কনটেন্টগুলো ফেসবুক থেকেই পোস্ট করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মাছরাঙা টেলিভিশন জানায়, দিনব্যাপী প্রচেষ্টার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বনানী থানা, সিআইডি, বিটিআরসি ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় অ্যাকাউন্টটি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রকাশিত কনটেন্টগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানহানির চেষ্টা হওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি ভুয়া কনটেন্ট নিয়ে বিভ্রান্ত না হওয়া, সেগুলো শেয়ার না করা এবং যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানায়। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করে তা ইতিবাচক কাজে ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয় বিবৃতিতে।
ঘটনার জন্য ফেসবুকে কেউ কেউ মাছরাঙার সাবেক এক কর্মীকে দায়ী করেছেন। তামজিদ রোকন নামে ওই ব্যক্তি ২০২১ সালে মাছরাঙায় যোগ দেন এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে চাকরি ছাড়েন। রিউমর স্ক্যানারের কাছে তিনি দায় অস্বীকার করে জানিয়েছেন, উল্টো তিনি এই ইস্যু সমাধানে মাছরাঙা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করেছেন। তার ভাষ্যমতে, এর আগেও প্রতিষ্ঠানটির বিজনেস সিস্টেম হ্যাক হয়েছিল, তখন তিনিই তা পুনরুদ্ধার করেছিলেন। মাহমুদ রুবেলও জানিয়েছেন, বিষয়টি সমাধানে রোকন তাদের সহায়তা করেছেন।
এদিকে ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে দিনভর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কেউ ট্রল করেছেন, কেউ সংশ্লিষ্ট অভিনেত্রীদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, আবার কেউ হ্যাকের দাবির সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। একজন লিখেছেন, অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে থাকুক বা না থাকুক, পোস্ট সরানোর জন্য প্রশাসকদের যথেষ্ট সময় ছিল। আরেকজন প্রশ্ন তুলেছেন, পোস্টগুলো ১২ ঘণ্টা আগে করা হলেও তারপরও কীভাবে স্বাভাবিক নিউজ পোস্ট চলছিল, কোনো দুঃখপ্রকাশও করা হয়নি। কেউ কেউ এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্য কোনো ইস্যু আড়াল করার সন্দেহও প্রকাশ করেছেন। রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, হ্যাক দাবির পরও প্রোফাইলের স্বাভাবিক কার্যক্রম চলমান থাকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের ব্যাখ্যা আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি, আর লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর পরও সকাল পর্যন্ত কোনো উত্তর মেলেনি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুয়া তথ্যও ছড়িয়েছে। 'Sayma Mahi' নামের একটি ফেসবুক পেজ মাছরাঙার আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ডে পরী মণির বক্তব্য হিসেবে একটি উদ্ধৃতি প্রচার করেছে। রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরী মণি এই ইস্যুতে কোনো মন্তব্যই করেননি, অর্থাৎ ফটোকার্ডটি সম্পূর্ণ ভুয়া।
একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে এ ধরনের কনটেন্ট প্রকাশ শুধু প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির জন্য নয়, দর্শক ও অনুসারীদের আস্থার জন্যও বড় ধাক্কা। এ ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, এআই ও ফেস-সোয়াপ প্রযুক্তির অপব্যবহার কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে কারো সম্মানহানি ঘটাতে পারে, আর একবার ভাইরাল হয়ে গেলে সত্য যাচাই কতটা কঠিন হয়ে পড়ে। ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়া প্রমাণ করে, সংকটের মুহূর্তে যাচাই না করা তথ্য কীভাবে আগুনে ঘি ঢালে।
মামলা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানালেও তদন্ত কতদূর এগোল, হ্যাকারদের শনাক্ত করা গেল কিনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত তারকাদের পক্ষ থেকে কোনো আইনি পদক্ষেপ আসে কিনা, সেদিকেই এখন সবার নজর। বড় সংবাদমাধ্যমগুলো এখনো বিস্তারিত রিপোর্ট করেনি, ফলে নতুন যাচাইকৃত তথ্য পাওয়া মাত্র এই প্রতিবেদন হালনাগাদ করা হবে।
