ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে কুমিল্লার দিকে গেলে হঠাৎ চোখে পড়ে সবুজ টিলার সারি। এই লালমাই পাহাড়ের ঢালেই লুকিয়ে আছে বাংলার অন্যতম সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল ময়নামতি। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে এখানে গড়ে উঠেছিল ৫০টির বেশি বৌদ্ধ বসতি, যা ছিল প্রাচীন সমতট জনপদের প্রাণকেন্দ্র।
আজ ময়নামতি মানে শালবন বিহারের ধ্বংসাবশেষ, সমৃদ্ধ জাদুঘর, রানী ময়নামতীর প্রাসাদ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবাহী ওয়ার সিমেট্রি। ঢাকা থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ, একদিনেই ঘুরে আসা যায়। এই গাইডে থাকছে ময়নামতির ইতিহাস, কী কী দেখবেন, কীভাবে যাবেন, খরচ, থাকা, খাওয়া আর টিপস।
কেন যাবেন
ময়নামতি নামটি এসেছে চন্দ্র রাজবংশের রানী ময়নামতীর নাম থেকে, যিনি ছিলেন রাজা গোবিন্দচন্দ্রের মা। প্রাচীন বাংলার সমতট জনপদের অংশ হিসেবে এই অঞ্চল একসময় ছিল বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির উর্বর ভূমি। লালমাই পাহাড়ের প্রাকৃতিক সুরক্ষার মধ্যে গড়ে ওঠা বিহারগুলোতে ভিক্ষুরা ধ্যান, শাস্ত্রচর্চা আর শিল্পকলায় মগ্ন থাকতেন।
এই অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন শালবন বিহার। সপ্তম থেকে অষ্টম শতকে নির্মিত এই বিহার পাহাড়পুর ধাঁচের, ১১৫টি ভিক্ষুকক্ষ নিয়ে। ধারণা করা হয়, দেব বংশের রাজা ভবদেব এই বিহার নির্মাণ করেন। দ্বাদশ শতক পর্যন্ত এখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পদচারণা ছিল। বিহারের কেন্দ্রীয় মন্দির আর চারপাশের কক্ষগুলোর ধ্বংসাবশেষ আজও সেই যুগের স্থাপত্যজ্ঞানের সাক্ষ্য দেয়।
ময়নামতির গুরুত্ব শুধু শালবন বিহারেই সীমাবদ্ধ নয়। কোটিলা মুড়া, চারপত্র মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, রূপবান মুড়াসহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ঢিবি ও ধ্বংসাবশেষ। রানী ময়নামতীর প্রাসাদ ও মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ থেকে ধারণা পাওয়া যায় রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধ সংস্কৃতি কতটা বিকশিত হয়েছিল। খননে পাওয়া ব্রোঞ্জের মূর্তি, পাথরের ভাস্কর্য, টেরাকোটা ফলক, প্রাচীন মুদ্রা ও তাম্রশাসন প্রমাণ করে এই অঞ্চল ছিল শিল্প ও বাণিজ্যেরও কেন্দ্র।
লালমাই পাহাড়ের টিলাগুলোতে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে বোঝা যায় কেন প্রাচীন ভিক্ষুরা এই জায়গা বেছে নিয়েছিলেন। একদিকে সবুজ শালবনের ছায়া, অন্যদিকে সমতলের বিস্তার। প্রকৃতি আর ইতিহাসের এই মেলবন্ধন ময়নামতিকে শুধু প্রত্নতত্ত্বপ্রেমীদের নয়, প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও আকর্ষণীয় করেছে। ভোরের দিকে টিলার ওপর থেকে কুয়াশামাখা সমতলের দৃশ্য দেখার মতো।
কী কী দেখবেন
ভ্রমণ শুরু করুন ময়নামতি জাদুঘর দিয়ে। জাদুঘরে সাজানো আছে ব্রোঞ্জ ও পাথরের ভাস্কর্য, শত শত টেরাকোটা ফলক, প্রাচীন মুদ্রা, তাম্রশাসন, সিলমোহর আর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রী। ৮৬টি ব্রোঞ্জ সামগ্রীসহ দেড় শতাধিক ব্রোঞ্জ মূর্তি এখানকার সংগ্রহের গর্ব। প্রতিটি গ্যালারি ঘুরে দেখতে অন্তত এক ঘণ্টা সময় রাখুন।
জাদুঘরের কাছেই শালবন বিহার। ১১৫টি কক্ষের এই বিহার চত্বরে হেঁটে বেড়ান, কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভিত্তি দেখুন। পাহাড়পুরের তুলনায় ছোট হলেও এর পরিকল্পনা একই ধাঁচের, ফলে দুটো মিলিয়ে দেখলে প্রাচীন বাংলার বিহার স্থাপত্যের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়।
এরপর ঘুরে দেখুন কোটিলা মুড়া, ইটাখোলা মুড়া ও রূপবান মুড়া। প্রতিটি মুড়াতেই আলাদা আলাদা স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ আছে। রানী ময়নামতীর প্রাসাদ এলাকায় গেলে রাজকীয় স্থাপত্যের আভাস পাবেন। এই স্পটগুলো কাছাকাছি হওয়ায় সিএনজি বা অটোতে একে একে ঘোরা যায়।
ময়নামতি ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থাকবে ওয়ার সিমেট্রি না দেখলে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার এই সমাধিক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭৩৬টি কমনওয়েলথ সৈনিকের সমাধি আছে। সুসজ্জিত সবুজ চত্বরে সারি সারি সাদা ফলক দেখে যুদ্ধের নির্মমতা আর শান্তির মূল্য দুটোই অনুভব করা যায়। এখানে নীরবতা ও শালীনতা বজায় রাখুন।
ময়নামতি ঘোরা শেষে হাতে সময় থাকলে কুমিল্লার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানও দেখতে পারেন। শহরের প্রাণকেন্দ্রে ধর্মসাগর দীঘি, কোটবাড়িতে বার্ড চত্বর, ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্ক, ডাইনো পার্ক আর রাজেশপুর ইকো পার্ক ভ্রমণকারীদের কাছে জনপ্রিয়। একদিনে সব দেখা কঠিন, তাই অগ্রাধিকার ঠিক করে নিন, প্রত্নতাত্ত্বিক স্পটগুলোই আগে দেখুন।
কীভাবে যাবেন
বাসে: ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও কমলাপুর থেকে কুমিল্লাগামী বাসে উঠুন। উপকূল, তিশা, স্টার লাইন, বিআরটিসি, রয়েল, এশিয়া লাইন পরিবহনের বাস নিয়মিত চলে, ভাড়া জনপ্রতি ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা। চট্টগ্রাম বা ফেনীগামী যেকোনো বাসে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত এসেও নামতে পারেন। কোটবাড়ি বিশ্বরোড থেকে সিএনজি বা অটোতে ময়নামতি জাদুঘরে যাওয়া যায়।
ঢাকা থেকে কুমিল্লার দূরত্ব জাতীয় মহাসড়ক ধরে প্রায় ১১০ থেকে ১২০ কিলোমিটার, যানজট না থাকলে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। ভোরে রওনা দিলে সকাল ১০টার মধ্যে জাদুঘরে ঢুকে পড়া সম্ভব। ফেরার বাসের টিকিট আগেই কেটে রাখুন, বিকেলের দিকে কুমিল্লা থেকে ঢাকাগামী বাসে ভিড় হয়।
ট্রেনে: ঢাকা থেকে ট্রেনেও কুমিল্লা যাওয়া যায়। কুমিল্লা রেলস্টেশন থেকে সিএনজি বা অটোতে কোটবাড়ি হয়ে ময়নামতি পৌঁছান। ট্রেনের টিকিট অগ্রিম কেটে রাখাই ভালো। লঞ্চে সরাসরি কুমিল্লা যাওয়ার ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয় যাতায়াত: কোটবাড়ি এলাকায় শালবন বিহার, মুড়াগুলো আর জাদুঘর কাছাকাছি। সিএনজি রিজার্ভ করে নিলে একে একে সব স্পট ঘোরা সহজ হয়। ওয়ার সিমেট্রি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়, সেখানে যাওয়ার পথ আলাদা করে জেনে নিন।
খরচের ধারণা
ঢাকা থেকে ময়নামতি একদিনের ট্যুরে জনপ্রতি খরচ প্রায় ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা। বাসে যাওয়া আসা ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা, জাদুঘরের টিকিট বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় ৩০ টাকা, বিদেশিদের জন্য ১০০ টাকা। স্থানীয় সিএনজি বা অটো ভাড়া ১৫ থেকে ২০ টাকা করে প্রতি গন্তব্যে, রিজার্ভ নিলে বেশি। দুপুরের খাবারে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা ধরুন। ভাড়া ও টিকিটের মূল্য পরিবর্তন হতে পারে, ভ্রমণের আগে যাচাই করে নিন।
দল বেঁধে গেলে সিএনজি রিজার্ভ করে নিন, তাতে সময় বাঁচে আর ভাড়াও ভাগ হয়ে কমে। জাদুঘর, শালবন বিহার, মুড়াগুলো আর ওয়ার সিমেট্রি, এই চারটি পয়েন্টের জন্য সারাদিনের রিজার্ভে দরদাম আগেই ঠিক করে নিন। খুচরা টাকা সঙ্গে রাখুন, ছোট দোকানে বড় নোট ভাঙানো মুশকিল হয়।
কোথায় থাকবেন
ময়নামতি একদিনেই ঘুরে ফেরা যায়, তবে ধীরে সুস্থে দেখতে চাইলে কুমিল্লা শহরে এক রাত থাকতে পারেন। কুমিল্লার কান্দিরপাড়, শাসনগাছা ও স্টেশন রোড এলাকায় বিভিন্ন মানের হোটেল আছে। উল্লেখযোগ্য হোটেলের মধ্যে হোটেল ভিক্টোরিয়া, আমানিয়া রেস্ট হাউজ, হোটেল ড্রিম ল্যান্ড, মাসুম রেস্ট হাউজ ও হোটেল মেলোডির নাম পাওয়া যায়। কুমিল্লায় থেকে পরদিন ধর্মসাগর দীঘি, বার্ড চত্বর বা ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কও ঘুরে দেখতে পারেন।
কী খাবেন
কুমিল্লা মানেই মিষ্টি। মনোহরপুরের আসল মাতৃভাণ্ডারের বিখ্যাত রসমালাই না খেলে কুমিল্লা ভ্রমণ অসম্পূর্ণ। সঙ্গে চেখে দেখুন রসগোল্লা, ভগবতীর পেড়া, মিঠাইয়ের মালাই চপ আর মাতৃভূমির মালাইকারি। দুপুরে কুমিল্লা শহরের হোটেলগুলোতে ভাত, মাছ, মাংসের সাধারণ বাঙালি খাবার পাবেন। কোটবাড়ি এলাকার দোকানেও নাস্তার ব্যবস্থা আছে।
কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড় এলাকায় সকালের নাস্তার জন্য পুরি, সবজি আর চায়ের দোকানগুলোতে ভিড় লেগে থাকে। মিষ্টির দোকানে রসমালাই ছাড়াও ছানার তৈরি নানা মিষ্টি পাবেন। বাড়ির জন্য মিষ্টি নিতে চাইলে সকাল সকাল কিনুন, তাজা পাবেন। আর কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকানগুলোতে দুপুরে ভর্তা ভাজি দিয়ে ভাত খাওয়ার মজাই আলাদা।
যাওয়ার সেরা সময়
ময়নামতি যাওয়ার সেরা সময় শীতকাল, অক্টোবর থেকে মার্চ। এই সময় লালমাই পাহাড়ের সবুজ আর নীল আকাশের মেলায় চারপাশ দেখতে অপূর্ব লাগে। টিলার ওপরের প্রত্নস্থলগুলোতে হাঁটতেও আরাম। বর্ষায় পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল হয়, আর গ্রীষ্মের দুপুরে খোলা ঢিবিতে ওঠা কষ্টকর। শীতের সকালে হালকা কুয়াশায় শালবন বিহারের দৃশ্য মোহনীয়।
টিপস ও সতর্কতা
জাদুঘর ও শালবন বিহার রবিবার ও সরকারি ছুটির দিনে বন্ধ থাকে, সোমবার অর্ধদিবস খোলা। সেভাবেই পরিকল্পনা করুন। শীতকালে মঙ্গলবার থেকে শনিবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে, মাঝে দুপুর ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বিরতি। ওয়ার সিমেট্রিতে শালীন পোশাকে যান, হইচই করবেন না, সমাধিফলকে হাত দেবেন না। প্রত্নস্থলের ঢিবিতে ওঠার সময় সাবধানে পা ফেলুন, প্রাচীন ইটের গাঁথুনি নড়বড়ে হতে পারে। সঙ্গে পানি, ছাতা আর পাওয়ার ব্যাংক রাখুন।
টিলার ওপরের প্রত্নস্থলগুলোতে উঠতে গেলে ভালো গ্রিপের জুতা পরুন, বিশেষ করে বর্ষার পর পথ পিচ্ছিল থাকে। শীতকালে সকালে কুয়াশা থাকে বলে দূরের স্পটে যাওয়ার আগে আবহাওয়া দেখে নিন। জাদুঘরের ভেতরে ফ্ল্যাশ দিয়ে ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন, প্রাচীন নিদর্শনের জন্য ফ্ল্যাশের আলো ক্ষতিকর।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: ময়নামতি নামের অর্থ কী? উত্তর: ময়নামতি নাম এসেছে চন্দ্র রাজবংশের রানী ময়নামতীর নাম থেকে, যিনি রাজা গোবিন্দচন্দ্রের মা ছিলেন। এই অঞ্চল প্রাচীন সমতট জনপদের অংশ ছিল।
প্রশ্ন: শালবন বিহার কত পুরোনো? উত্তর: শালবন বিহার সপ্তম থেকে অষ্টম শতকে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। দেব বংশের রাজা ভবদেব এটি নির্মাণ করেন বলে মনে করা হয়, আর দ্বাদশ শতক পর্যন্ত এখানে বৌদ্ধ চর্চা চালু ছিল।
প্রশ্ন: জাদুঘরের টিকিট কত? উত্তর: বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় ৩০ টাকা, বিদেশিদের জন্য ১০০ টাকা। রবিবার ও সরকারি ছুটিতে জাদুঘর বন্ধ থাকে। ভ্রমণের আগে হালনাগাদ তথ্য যাচাই করে নিন।
প্রশ্ন: ওয়ার সিমেট্রি কোথায়? উত্তর: ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়। এখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭৩৬ জন কমনওয়েলথ সৈনিকের সমাধি আছে। শালবন বিহার থেকে সিএনজি বা অটোতে যাওয়া যায়।
