কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে কারো নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট বানিয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়াকে সরাসরি অপরাধ বলে অভিহিত করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। পোস্টে মেহজাবীন লিখেছেন, এআই ব্যবহার করে কারও নামে মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট তৈরি করা এবং কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়া কোনো বিনোদন নয়, এটি একটি অপরাধ।
পোস্টে মেহজাবীন শুধু কনটেন্ট তৈরিকারীদের দিকেই আঙুল তোলেননি। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের দায়িত্ববোধ নিয়েও। তাঁর ভাষ্য, যখন একই কনটেন্ট শত শত কিংবা হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করতে থাকে, তখন বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন এটি বড় একটি সামাজিক সমস্যার চিত্র তুলে ধরে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, সমাজ হিসেবে আমরা আসলে কোন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি।
পোস্টের সবচেয়ে আলোচিত অংশে মেহজাবীন লিখেছেন, এই পর্যায়ে এসে সেই পুরোনো কথাটাও আর বলতে ইচ্ছে করে না যে, একবার ভাবুন তো, এমনটা যদি আপনার মা কিংবা বোনের সঙ্গে ঘটত! তাঁর যুক্তি, কাউকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে তাকে আমাদের পরিবারের সদস্য হতে হবে কেন। প্রতিটি মানুষেরই সম্মান পাওয়ার অধিকার আছে, সেই সম্মান কারো আত্মীয় হওয়ার শর্তে বাঁধা থাকা উচিত নয়।
ভিউ, লাইক আর ট্রেন্ডিংয়ের প্রতিযোগিতা নিয়েও কড়া কথা বলেছেন মেহজাবীন। তিনি লিখেছেন, কিছু ভিউ, কিছু লাইক, কিছু শেয়ার, ট্রেন্ডিংয়ে থাকা, হয়তো সেখান থেকে কয়েকটা ডলার আয়, এটাই এখন অনেকের লক্ষ্য। তিনি স্বীকার করেছেন, মানুষের জীবনে সংগ্রাম আছে, অনেকের জন্য কনটেন্ট তৈরি করাই এখন জীবিকা নির্বাহের উপায়। সেই বাস্তবতাকে তিনি অস্বীকার করতে চান না। কিন্তু তাঁর প্রশ্ন, কবে থেকে অন্য একজন মানুষের অপমান আর অসম্মান আমাদের উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠল।
মেহজাবীনের পোস্টে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন, বিষয়টা এখন শুধু নারী কিংবা পুরুষের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নেই। ভিউ, এনগেজমেন্ট আর ট্রেন্ডিংয়ের এই প্রতিযোগিতা এখন লিঙ্গের সীমারেখাও ছাড়িয়ে গেছে। ক্ষতিকর কিছু ছড়িয়ে দেওয়ার অংশ হতে পারে যে কেউ, আবার এর শিকারও হতে পারে যে কেউ। তাঁর ভাষায়, তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভাবায় শুধু সেই মানুষটি নয়, যে এমন কিছু তৈরি করছে। বরং ভাবায় সেই অসংখ্য মানুষ, যারা স্বেচ্ছায় সেটি শেয়ার করছে, আলোচনা করছে এবং আরও হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
কেন এখন এই পোস্ট, সেই পটভূমিও গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সোশ্যাল মিডিয়া পেজ হ্যাক হয়ে সেখানে তারকাদের চেহারা বসানো একাধিক আপত্তিকর ডিপফেক ভিডিও প্রকাশ পায়। ভিডিওগুলো দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরে সংশ্লিষ্ট চ্যানেল হ্যাকিংয়ের বিষয়টি স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করে। এই ঘটনার পরই মেহজাবীনের মতো শীর্ষ তারকারা সরব হন।
মেহজাবীন চৌধুরী বাংলাদেশের ছোট পর্দা ও ওটিটির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য জনপ্রিয় নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি ওয়েব সিরিজেও তিনি শীর্ষস্থানীয় তারকা। তাঁর মতো প্রভাবশালী অভিনেত্রীর এই স্পষ্ট অবস্থান এআই অপব্যবহার নিয়ে চলমান আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিপফেক প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হচ্ছে, ততই বাড়ছে এর অপব্যবহার। শুধু তারকা নন, সাধারণ মানুষও এখন এই ঝুঁকির মুখে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় মেহজাবীনের পোস্ট ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তাঁর বক্তব্যের পক্ষে-বিপক্ষে চলছে আলোচনা। অনেকেই মনে করছেন, দায়িত্বশীল কনটেন্ট সংস্কৃতি গড়তে এমন স্পষ্ট বক্তব্য জরুরি ছিল। আবার কেউ কেউ বলছেন, শুধু সচেতনতা নয়, এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া দরকার। যেভাবেই হোক, এআই দিয়ে বানানো ভুয়া কনটেন্ট নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা এখন তুঙ্গে, আর সেই আলোচনার কেন্দ্রে আছেন মেহজাবীন চৌধুরী।
মেহজাবীনের এই পোস্টের প্রভাব শুধু তাঁর নিজের ফলোয়ারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। প্রথম আলোর ফেসবুক পেজে মেহজাবীনের বক্তব্যের কোট কার্ড প্রকাশের পর তাতে হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া জমা পড়ে, যা থেকে বোঝা যায় বিষয়টি কতটা গভীরে নাড়া দিয়েছে পাঠকদের। ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসেও তাঁর বক্তব্য নিয়ে তৈরি গ্রাফিক ও রিল ব্যাপকভাবে শেয়ার হচ্ছে।
উল্লেখ্য, পোস্টের পর মেহজাবীন নিজে তাঁর কমেন্ট থ্রেডে এক কটাক্ষকারীর মন্তব্যের জবাবও দিয়েছেন, যা আলাদাভাবে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অর্থাৎ তিনি শুধু একবার বলে থেমে যাননি, বিতর্কের মুখোমুখি হয়েও নিজের অবস্থানে অটল থেকেছেন। প্রযুক্তি ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিপফেকের মতো প্রযুক্তিগত অপরাধ মোকাবিলায় শুধু সচেতনতা যথেষ্ট নয়, দরকার কার্যকর আইনি কাঠামো ও দ্রুত ব্যবস্থা। মেহজাবীনের এই সরব অবস্থান সেই আলোচনাকেই আরও জোরদার করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
