বিনোদন ঝলক
ভ্রমণ

নাফাখুম ভ্রমণ গাইড ২০২৬: বাংলার নায়াগ্রা জয়ের সম্পূর্ণ পরিকল্পনা

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৭ অক্টোবর ২০২৬8 মিনিটে পড়ুন
নাফাখুম ভ্রমণ গাইড ২০২৬: বাংলার নায়াগ্রা জয়ের সম্পূর্ণ পরিকল্পনা

বাংলাদেশের জলপ্রপাতগুলোর মধ্যে নাফাখুমের জায়গাটা আলাদা। বান্দরবানের থানচি উপজেলার গভীরে, সাঙ্গু নদীর শাখা রেমাক্রি খালের বুকে এই জলপ্রপাতকে বলা হয় বাংলার নায়াগ্রা। নামটা শুনে অতিরঞ্জন মনে হতে পারে, কিন্তু রেমাক্রি খাল ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে যখন প্রথমবার এর গর্জন কানে আসে, তখন বোঝা যায় কেন এই তুলনা। চওড়া পাথুরে ধাপ বেয়ে ধবধবে সাদা পানি নেমে আসার দৃশ্য, চারপাশে ঘন সবুজ পাহাড় আর খালের স্বচ্ছ পানি মিলে নাফাখুম হয়ে উঠেছে দেশের সেরা ট্রেকিং গন্তব্যগুলোর একটি। তবে একটা কথা শুরুতেই পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো: নাফাখুম কোনো সাধারণ পিকনিক স্পট নয়। এখানে পৌঁছাতে হলে নৌকা, হাঁটা, খাল পারাপার আর সেনা-বিজিবির অনুমতি সব মিলিয়ে সত্যিকারের অভিযান পাড়ি দিতে হয়। সেই অভিযানের সম্পূর্ণ পরিকল্পনাই এই গাইড।

কেন যাবেন: নাফাখুম যাওয়ার পথটাই আসলে অর্ধেক আনন্দ। বান্দরবান থেকে থানচির পাহাড়ি সড়ক পেরিয়ে নীলগিরি, চিম্বুকের পাশ দিয়ে যাওয়া, তারপর থানচি ঘাট থেকে সাঙ্গু নদী বেয়ে ইঞ্জিন বোটে রেমাক্রি যাওয়া, এই পুরো যাত্রাটাই একটা ভ্রমণ। পথে পড়বে তিন্দু, বড় পাথর বা রাজা পাথর, রেমাক্রি ঝর্ণার মতো দর্শনীয় জায়গা। রেমাক্রি থেকে নাফাখুম পর্যন্ত ২ থেকে ৩ ঘণ্টার ট্রেকিংয়ে রেমাক্রি খালের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ি জীবন, মারমা পাড়া আর খালের স্বচ্ছ পানির সৌন্দর্য দেখা যায়। আর গন্তব্যে পৌঁছে যে দৃশ্য অপেক্ষা করে, তা সারা জীবনের স্মৃতি হয়ে থাকে। যারা সত্যিকারের অ্যাডভেঞ্চার চান, শরীরী পরিশ্রম করে প্রকৃতির সেরা রূপ দেখতে চান, তাদের জন্য নাফাখুমের বিকল্প কম।

কী কী দেখবেন: মূল আকর্ষণ নাফাখুম জলপ্রপাত নিজে। খালের পানি চওড়া পাথরের ধাপ বেয়ে নিচে পড়ে তৈরি করেছে ফেনিল জলধারা, বর্ষার পর এর রূপ সবচেয়ে ভয়ংকর সুন্দর। ঝর্ণার নিচের কুণ্ডে সাঁতার কাটা যায়, তবে স্রোতের অবস্থা বুঝে গাইডের পরামর্শে। যাওয়ার পথে সাঙ্গু নদীর দুই পাশের পাহাড়, তিন্দুর পাথুরে সৌন্দর্য, বড় পাথর ও রাজা পাথর নামের বিশাল শিলাখণ্ড, রেমাক্রি ঝর্ণা আর রেমাক্রি বাজারের পাহাড়ি জীবন দেখার মতো। রেমাক্রি থেকে নাফাখুমের ট্রেকিং পথে খালের পাশে ছোট ছোট ঝিরি, পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ পানি আর ঘন জঙ্গল আপনাকে মুগ্ধ করবে। সময় থাকলে নাফাখুম থেকে ফেরার পথে রেমাক্রিতে সূর্যাস্ত দেখুন, সাঙ্গু নদীর ওপর সূর্য ডোবার দৃশ্য অসাধারণ।

কীভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে প্রথমে বান্দরবান। গুলিস্তান বা সায়েদাবাদ থেকে বান্দরবানগামী বাস ছাড়ে, নন এসি ভাড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, এসি ১,০০০ থেকে ১,৬০০ টাকা। সময় লাগে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, তাই রাতের বাসে যাওয়াই সুবিধাজনক। বান্দরবান শহর থেকে থানচি যেতে হবে। থানচি বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রতি ঘণ্টায় লোকাল বাস ছাড়ে, ভাড়া জনপ্রতি প্রায় ২০০ টাকা, সময় লাগে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা। দল বেঁধে গেলে চাঁদের গাড়ি বা জীপ রিজার্ভ করতে পারেন, ভাড়া ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০ টাকা, সময় লাগে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা। পথে মিলনছড়ি, চিম্বুক ও নীলগিরি পড়বে। থানচি পৌঁছে প্রথম কাজ গাইড ঠিক করা। নাফাখুম যেতে সার্টিফাইড গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক, দল যত ছোটই হোক। একদিনের ট্যুরের জন্য গাইড ফি প্রায় ১,৫০০ টাকা। এরপর থানচির বিজিবি ক্যাম্প বা থানায় গিয়ে অনুমতি নিতে হবে, সবার পরিচয়পত্রের তথ্য জমা দিতে হয়। মনে রাখবেন, বিকাল ৩টার পর থানচি থেকে রেমাক্রির উদ্দেশে রওনা দেওয়া নিষেধ, তাই দুপুর ২টার মধ্যে থানচি পৌঁছানোর পরিকল্পনা করুন। অনুমতি পেলে থানচি ঘাট থেকে ইঞ্জিন বোট ভাড়া করুন, যাওয়া আসা মিলিয়ে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা, সময় লাগে ২ থেকে আড়াই ঘণ্টা। এক বোটে ৫ জন পর্যন্ত ওঠা যায়। পানি কম থাকলে মাঝপথে নেমে হাঁটতে হতে পারে। রেমাক্রি পৌঁছে স্থানীয় আরেকজন গাইড নিতে হয়, ফি প্রায় ৫০০ টাকা, থানচির গাইডই ব্যবস্থা করে দেন। রেমাক্রি থেকে রেমাক্রি খাল ধরে হেঁটে নাফাখুম যেতে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা লাগে। বর্ষায় খালে পানি বেশি থাকে, কোথাও কোমরসমান পানি পেরোতে হয়, গাইড সাহায্য করবেন। সাধারণত সকালে বান্দরবান থেকে রওনা দিলে রেমাক্রি পৌঁছাতে বিকাল হয়ে যায়, তাই ওই রাত রেমাক্রিতে থেকে পরদিন সকালে নাফাখুম যাওয়াই ভালো পরিকল্পনা।

খরচের ধারণা: নাফাখুম ট্রিপে জনপ্রতি খরচ নির্ভর করে দলের আকারের ওপর, কারণ বোট, গাড়ি ও গাইডের খরচ ভাগ হয়। ১০ থেকে ১৪ জনের দলে গেলে ২ রাত ৩ দিনের ট্রিপে জনপ্রতি ৫,৫০০ থেকে ৮,০০০ টাকার মধ্যে সারা সম্ভব। বড় খরচগুলো: ঢাকা বান্দরবান বাস যাওয়া আসা ১,৪০০ থেকে ৩,২০০ টাকা, থানচি যাওয়া আসায় চাঁদের গাড়ি ভাগে প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা, বোট ভাড়া ভাগে প্রায় ১,০০০ টাকা, গাইড ফি ভাগে কয়েকশ টাকা, থাকা ও খাওয়া বাকিটা। ছোট দলে গেলে জনপ্রতি খরচ বাড়বে। মনে রাখবেন, এই হিসাব আনুমানিক, ভাড়া ও ফি সময়ের সঙ্গে বদলায়, তাই ভ্রমণের আগে যাচাই করে নিন।

কোথায় থাকবেন: থানচিতে ভালো মানের থাকার জন্য বিজিবি নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত অবকাশ কেন্দ্র আছে, রুম ভাড়া ১,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা। এছাড়া থানচি বাজার ও আশপাশে কটেজ ও রেস্টহাউজ ধরনের হোটেল আছে, মান অনুযায়ী দিনপ্রতি ১,০০০ থেকে ২,০০০ টাকা। রেমাক্রি বাজারে আদিবাসীদের ঘরে থাকার ব্যবস্থা আছে, সাঙ্গু নদীর পাশে কয়েকজন মিলে থাকলে জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ১৫০ টাকা। ব্যবস্থা সাধারণ মানের, কিন্তু নদীর পাশে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা অসাধারণ। বান্দরবান শহরে সব বাজেটের হোটেল আছে, যাত্রার আগে বা পরে সেখানে থাকা যায়।

কী খাবেন: থানচি বাজারে মোটামুটি মানের খাওয়ার হোটেল আছে, সেখানে ভাত, ডাল, সবজি, মুরগি পাবেন। রেমাক্রিতে আদিবাসী বাড়িতেই খাওয়ার ব্যবস্থা, আগে থেকে গাইডকে জানিয়ে রাখলে প্যাকেজ সিস্টেমে রান্না করে দেন। সাধারণত ভাত, ভর্তা, ভাজি ও ডিমে খরচ পড়ে প্রায় ৮০ টাকা, মুরগি নিলে প্রায় ১২০ টাকা। পাহাড়ি এলাকার বিশেষ স্বাদ হিসেবে বাঁশ কোড়ল (বাঁশের কচি ডগা) দিয়ে রান্না তরকারি, পাহাড়ি মুরগির ঝোল আর জুমের চালের ভাত চেখে দেখতে পারেন। ট্রেকিংয়ের দিন সঙ্গে শুকনো খাবার, খেজুর, বাদাম ও পর্যাপ্ত পানি রাখুন। রেমাক্রিতে দোকান সীমিত, তাই প্রয়োজনীয় জিনিস থানচি বা বান্দরবান থেকে কিনে নিন।

যাওয়ার সেরা সময়: নাফাখুম যাওয়ার সেরা সময় শুষ্ক মৌসুম, অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মার্চ। এই সময় সাঙ্গু নদী ও রেমাক্রি খালে পানি কম থাকে, খাল পারাপার সহজ ও নিরাপদ হয়, ট্রেকিং আরামদায়ক হয়। বর্ষাকালে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) ঝর্ণায় পানি সবচেয়ে বেশি থাকে, দেখতে সবচেয়ে সুন্দর লাগে, কিন্তু খাল ও নদীতে স্রোত বেড়ে পারাপার বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। অনেক সময় বর্ষায় প্রশাসন পর্যটকদের যাতায়াতে বিধিনিষেধ দেয়। তাই নিরাপত্তার কথা ভেবে শুষ্ক মৌসুমেই যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ, বিশেষ করে যারা প্রথমবার যাচ্ছেন।

টিপস ও সতর্কতা: পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তাই প্রথম শর্ত। গাইড ছাড়া কখনোই রেমাক্রি বা নাফাখুমের পথে যাবেন না, এটি বাধ্যতামূলক নিয়মও। সবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সঙ্গে রাখুন, অনুমতির সময় লাগবে। বর্ষায় সাঙ্গু নদীতে পানি বাড়লে বোট চলাচল বন্ধ থাকতে পারে, যাত্রার আগে আবহাওয়া ও স্থানীয় পরিস্থিতি জেনে নিন। খাল পারাপারের সময় গাইডের নির্দেশ মেনে চলুন, পিচ্ছিল পাথরে তাড়াহুড়ো করবেন না। সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করুন, থানচিতে ভাড়ায় পাওয়া যায়। বিকাল ৩টার পর থানচি থেকে রেমাক্রি রওনা নিষেধ, এই নিয়ম অমান্য করবেন না। পাহাড়ি পাড়ায় স্থানীয়দের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন, তাদের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখান। প্লাস্টিক বর্জ্য খাল বা ঝর্ণায় ফেলবেন না। অন্ধকারে ট্রেকিং করবেন না, দিনের আলো থাকতে থাকতে গন্তব্যে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করুন।

প্রস্তুতির তালিকা: ভালো গ্রিপের ট্রেকিং জুতা বা স্যান্ডেল, হালকা দ্রুত শুকনো কাপড়, রেইনকোট বা পঞ্চো, পাওয়ার ব্যাংক, টর্চলাইট, প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স, মশার কামড় থেকে বাঁচার ক্রিম আর পর্যাপ্ত পানির বোতল সঙ্গে নিন। ভারী লাগেজ না নিয়ে ছোট ব্যাকপ্যাকে প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিন, কারণ খাল পেরোনোর সময় ভারী ব্যাগ বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশ্ন: নাফাখুম যেতে কি পারমিশন লাগে? উত্তর: হ্যাঁ। থানচির বিজিবি ক্যাম্প বা থানায় গিয়ে অনুমতি নিতে হয়, সবার পরিচয়ের তথ্য জমা দিতে হয়। সার্টিফাইড গাইড নেওয়াও বাধ্যতামূলক।

প্রশ্ন: নাফাখুম ট্রিপে কতদিন লাগে? উত্তর: সাধারণত ২ রাত ৩ দিন। প্রথম দিন বান্দরবান থেকে থানচি হয়ে রেমাক্রি, দ্বিতীয় দিন নাফাখুম ঘুরে রেমাক্রি বা থানচিতে রাত, তৃতীয় দিন ফেরা।

প্রশ্ন: বর্ষাকালে কি নাফাখুম যাওয়া যায়? উত্তর: বর্ষায় ঝর্ণা সবচেয়ে সুন্দর, কিন্তু খাল ও নদীতে স্রোত বেড়ে যাওয়ায় পারাপার বিপজ্জনক হয়। অনেক সময় প্রশাসনিক বিধিনিষেধ থাকে। নিরাপদ ভ্রমণের জন্য শুষ্ক মৌসুম (নভেম্বর থেকে মার্চ) সেরা।

প্রশ্ন: সাঁতার না জানলে কি নাফাখুম যাওয়া যাবে? উত্তর: যাবে, তবে সতর্কতা জরুরি। খাল পারাপারে গাইড সাহায্য করেন, আর কুণ্ডে নামতে চাইলে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করুন।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার