ভূমিকা ঢাকার কোলাহল থেকে মাত্র এক রাতের যাত্রায় পৌঁছে যাওয়া যায় এমন এক দ্বীপে, যেখানে ভোরবেলা ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে আর সন্ধ্যা নামে সাগরের গর্জনে। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নিঝুম দ্বীপ এমনই এক জায়গা, যাকে অনেকে বলেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সুন্দরবন। ম্যানগ্রোভ বন, চিত্রা হরিণের পাল, বিস্তীর্ণ সৈকত আর জেলেদের সরল জীবন মিলিয়ে এই দ্বীপ ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এখন অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। শীতকালে এখানে পর্যটকের ভিড় বাড়ে, তবে সারা বছরই যাওয়া যায়। এই গাইডে রইল যাওয়া-আসা, খরচ, থাকা, খাওয়া আর জরুরি টিপসের পূর্ণাঙ্গ তথ্য।
কেন যাবেন নিঝুম দ্বীপ যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ এর বুনো ও নিরিবিলি সৌন্দর্য। সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ চোখে পড়তে পারে হরিণের পাল, যা বাংলাদেশের আর কোথাও এত সহজে দেখা যায় না। দ্বীপের চারপাশে সমুদ্র, ভেতরে সবুজ বন আর মাঝে মাঝে জেলে পল্লী, এই সমন্বয় শহুরে জীবন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা দেয়। যারা ক্যাম্পিং ভালোবাসেন, তাদের জন্য সৈকতের পাশে তাবু খাটিয়ে রাত কাটানো স্মরণীয় হবে। ফটোগ্রাফারদের জন্য ভোরের কুয়াশা, সন্ধ্যার সূর্যাস্ত আর জেলেদের নৌকার সারি দারুণ ফ্রেম তৈরি করে। আর যারা নিরিবিলি চান, ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির কোলে কয়েকটা দিন কাটানোর এর চেয়ে ভালো জায়গা দেশে কমই আছে।
কী কী দেখবেন নিঝুম দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান। বন বিভাগের এই এলাকায় হরিণ দেখার সবচেয়ে ভালো সুযোগ মেলে। ভোরবেলা বা বিকেলের দিকে স্থানীয় গাইড নিয়ে বনে ঢুকলে হরিণের পাল চোখে পড়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। উদ্যানের ভেতরে একটি ওয়াচ টাওয়ার আছে, সেখান থেকে পুরো দ্বীপ আর আশপাশের চরগুলোর প্যানোরামিক ভিউ পাওয়া যায়। বনের ভেতর দিয়ে হাঁটার পথে নানা প্রজাতির পাখির ডাক শোনা যায়, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।
দ্বীপের আশপাশে ছড়িয়ে থাকা চরগুলো ঘুরে দেখা এই ভ্রমণের আরেক মজা। কমলার দিঘির চর, কমলার চর আর হরিণের চর নামে কয়েকটি চর পর্যটকদের কাছে পরিচিত। ট্রলার ভাড়া করে দিনভর এসব চর ঘোরা যায়, প্রতিটি চরেরই আলাদা চরিত্র আছে। কোথাও বিস্তীর্ণ বালুচর, কোথাও কেওড়া বনের সারি। সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা আর জোয়ারের সময় ঢেউয়ের গর্জন শোনা নিঝুম দ্বীপের স্মরণীয় মুহূর্ত। নামার বাজার এলাকায় জেলেদের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখা যায়, সকালে নৌকা থেকে মাছ নামানোর দৃশ্য দেখতে ভিড় জমান অনেকে।
কীভাবে যাবেন বাসে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে প্রথমে নোয়াখালীর সোনাপুর বা মাইজদীগামী বাসে উঠতে হবে। সোনাপুর বাজার থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় চেয়ারম্যান ঘাট যাওয়া যায়, রিজার্ভ সিএনজির ভাড়া পড়ে প্রায় ৫০০ টাকার মতো। চেয়ারম্যান ঘাট থেকে ফেরি বা সি-ট্রাকে হাতিয়ার নলচিরা ঘাট, ফেরিতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা আর ভাড়া জনপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা। নলচিরা থেকে সিএনজিতে মুক্তারিয়া ঘাট বা কমলার দিঘির চর, সেখান থেকে ট্রলারে নিঝুম দ্বীপ, জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ৫০ টাকা।
লঞ্চে যেতে চাইলে ঢাকার সদরঘাট থেকে হাতিয়াগামী লঞ্চে উঠতে হবে। লঞ্চ সাধারণত বিকেলের দিকে ছাড়ে আর পরদিন সকালে হাতিয়ার তমরদ্দিন ঘাটে পৌঁছায়। ডেকের ভাড়া জনপ্রতি প্রায় ৫০০ টাকা, কেবিন নিলে খরচ বেশি পড়ে। তমরদ্দিন ঘাট থেকে সিএনজি রিজার্ভ করে কমলার দিঘি বা মুক্তারিয়া ঘাট যাওয়া যায়, পাঁচজনের সিএনজিতে ভাড়া প্রায় ৭০০ টাকা। সেখান থেকে ট্রলারে নিঝুম দ্বীপ পৌঁছানো যায়।
ট্রেনে সরাসরি নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যায় না। তবে ঢাকা থেকে ট্রেনে নোয়াখালী বা চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে বাস বা সিএনজিতে চেয়ারম্যান ঘাট পৌঁছে বাকি পথ নৌপথে যাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, চেয়ারম্যান ঘাট বা নলচিরা থেকে সি-ট্রাক জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে চলে, আর বিকেল ৫টার পর ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তাই হাতে সময় নিয়ে রওনা দেওয়াই ভালো। নিঝুম দ্বীপের খেয়াঘাট থেকে নামার বাজার যেতে ভ্যান বা অটোতে জনপ্রতি প্রায় ৫০ থেকে ৭৫ টাকা লাগে।
খরচের ধারণা নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের খরচ অনেকটাই নির্ভর করে দলের আকার আর যাতায়াত মাধ্যমের ওপর। ঢাকা থেকে যাওয়া-আসার যাতায়াত খরচ জনপ্রতি প্রায় ১২০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে পড়তে পারে। দ্বীপে ঘোরার জন্য ট্রলার রিজার্ভ নিলে খরচ পড়ে প্রায় ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা, যা দলের সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়া যায়। স্পিডবোট রিজার্ভে খরচ বেশি, প্রায় ৪০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। থাকার খরচ রাতপ্রতি জনপ্রতি প্রায় ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা, আর খাওয়ায় দিনে প্রায় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা লাগতে পারে। সব মিলিয়ে দুই দিন এক রাতের ভ্রমণে জনপ্রতি মোট খরচ পড়তে পারে প্রায় ৩০০০ থেকে ৫০০০ টাকা। এগুলো আনুমানিক হিসাব, মৌসুম আর দরদামের ওপর খরচ কমবেশি হতে পারে, তাই ভ্রমণের আগে যাচাই করে নিন।
কোথায় থাকবেন নিঝুম দ্বীপের মূল কেন্দ্র নামার বাজার, এখানেই থাকার বেশিরভাগ ব্যবস্থা। বাজারে কয়েকটি হোটেল আর বোর্ডিং আছে, চারজনের রুমের ভাড়া প্রায় ১৫০০ টাকার মতো হতে পারে। শীত মৌসুমে ভিড় বেশি থাকে, তাই আগে থেকে বুকিং করে যাওয়া ভালো। যারা রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তারা সৈকতের পাশে তাবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করতে পারেন, দুজনের তাবুর ভাড়া প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। বন বিভাগের বাংলোতেও অনুমতি নিয়ে থাকা যায়। থাকার জায়গা বাছাইয়ের সময় বিদ্যুৎ ব্যবস্থা আছে কি না জেনে নিন, কারণ দ্বীপে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ নেই, সোলার আর জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়।
কী খাবেন নিঝুম দ্বীপে খাবারের আয়োজন শহরের মতো বিলাসবহুল নয়, তবে তাজা সামুদ্রিক মাছের স্বাদ ভোলার মতো নয়। নামার বাজারের হোটেলগুলোতে সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি ভাজা, মোটা চালের ভাত আর ডাল পাওয়া যায়। আগে থেকে অর্ডার করে রাখলে ভালো মানের খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। স্থানীয়দের মধ্যে হোটেল আসিফের খাবারের সুনাম আছে। সৈকতের পাশে বসে ডাব খাওয়ার মজাই আলাদা, ডাবের দাম প্রায় ২০ থেকে ২৫ টাকা। বারবিকিউ করতে চাইলে রিসোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা করা যায়। খাবারের দাম মোটামুটি সাধ্যের মধ্যে, তবে মৌসুমে কিছুটা বাড়তে পারে।
যাওয়ার সেরা সময় নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের সেরা সময় শীতকাল, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এই সময় সাগর শান্ত থাকে, আবহাওয়া মনোরম আর হরিণ দেখার সুযোগও বেশি। এপ্রিল থেকে সাগর ধীরে ধীরে অশান্ত হতে শুরু করে, তখন ট্রলারে সমুদ্র পাড়ি দেওয়া বেশ রোমাঞ্চকর হলেও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি আর উত্তাল সাগরের কারণে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য শীত মৌসুমই সেরা। যারা ভিড় এড়াতে চান, তারা শীতের শুরু বা শেষের দিকে যেতে পারেন।
টিপস ও সতর্কতা নিঝুম দ্বীপে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ নেই, তাই পাওয়ার ব্যাংক, টর্চ আর অতিরিক্ত ব্যাটারি সঙ্গে রাখুন। মোবাইল নেটওয়ার্ক সব অপারেটরের সমান পাওয়া যায় না, কিছু এলাকায় শুধু নির্দিষ্ট অপারেটরের নেটওয়ার্ক মেলে। জোয়ার-ভাটার সময় মেনে ট্রলার বা স্পিডবোটের সময় ঠিক করুন, ভাটার সময় চরে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। জাতীয় উদ্যান এলাকায় হরিণ বা বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করবেন না, দূর থেকে দেখুন আর ছবি তুলুন। প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে দ্বীপের পরিবেশ নষ্ট করবেন না, নিজের ময়লা নিজে নিয়ে আসুন। স্থানীয় মানুষ খুব অতিথিপরায়ণ, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন। দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করলে খরচ কমে আর নিরাপত্তাও বাড়ে।
দুই দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা নিঝুম দ্বীপের জন্য সবচেয়ে ভালো পরিকল্পনা দুই দিন এক রাতের। প্রথম দিন সকালে দ্বীপে পৌঁছে নামার বাজারে থাকার ব্যবস্থা করে দুপুরের খাবার সেরে নিন। বিকেলে জাতীয় উদ্যানের ওয়াচ টাওয়ার আর আশপাশের বন ঘুরুন, সন্ধ্যায় সৈকতে সূর্যাস্ত দেখুন। রাতে চাইলে তাবুতে ক্যাম্পিং বা বাজারের হোটেলে থাকুন। দ্বিতীয় দিন ভোরবেলা হরিণ দেখার জন্য বনে যান, এটাই সবচেয়ে ভালো সময়। এরপর ট্রলারে কমলার চর বা হরিণের চর ঘুরে দুপুরের পর ফেরার পথ ধরুন। জোয়ার-ভাটার সময় মিলিয়ে ফেরার ট্রলার ঠিক করতে ভুলবেন না।
আশপাশের আকর্ষণ নিঝুম দ্বীপে গেলে আশপাশের আরও কিছু জায়গা ঘুরে দেখা যায়। হাতিয়া দ্বীপের তমরদ্দিন ঘাট এলাকায় স্থানীয় বাজার আর জেলে পল্লী আছে। কমলার দিঘির চরে অনেকে ক্যাম্পিং করেন, জোয়ারের সময় চরের চারপাশে পানি আর ভাটার সময় বিস্তীর্ণ বালুচর দেখা যায়। যাদের হাতে অতিরিক্ত দিন আছে, তারা ভোলার চর কুকরি মুকরিও ঘুরে আসতে পারেন, যা নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণপথের কাছাকাছি আরেকটি সুন্দর চরাঞ্চল। তবে প্রতিটি বাড়তি গন্তব্যের জন্য নৌযানের সময় আর জোয়ার-ভাটা আগেই জেনে নিন।
প্রশ্ন: নিঝুম দ্বীপে কি হরিণ দেখা নিশ্চিত? উত্তর: নিশ্চিত নয়, তবে ভোরবেলা বা বিকেলে স্থানীয় গাইড নিয়ে জাতীয় উদ্যানে গেলে হরিণের পাল দেখার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। শীতকালে সুযোগ সবচেয়ে ভালো।
প্রশ্ন: একদিনে কি নিঝুম দ্বীপ ঘুরে আসা যায়? উত্তর: ঢাকা থেকে একদিনে ঘুরে আসা প্রায় অসম্ভব, কারণ যাতায়াতেই অনেকটা সময় লেগে যায়। কমপক্ষে দুই দিন এক রাতের পরিকল্পনা করুন, তাহলে দ্বীপটা ভালোভাবে উপভোগ করা যাবে।
প্রশ্ন: নিঝুম দ্বীপে এটিএম বা মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা আছে কি? উত্তর: দ্বীপে এটিএম নেই, আর মোবাইল ব্যাংকিংও সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। তাই পর্যাপ্ত নগদ টাকা সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই নিরাপদ।
প্রশ্ন: বর্ষাকালে কি নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যায়? উত্তর: যাওয়া যায়, তবে ভারী বৃষ্টি আর উত্তাল সাগরের কারণে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নিরাপদ ভ্রমণের জন্য শীতকাল, অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, সেরা সময়।
প্রশ্ন: শিশু বা বয়স্কদের নিয়ে কি নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যায়? উত্তর: যাওয়া যায়, তবে নৌপথ দীর্ঘ আর দ্বীপে চিকিৎসা সুবিধা সীমিত। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে গেলে শীতকালে যান, যখন সাগর শান্ত থাকে, আর প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখুন।
প্রশ্ন: নিঝুম দ্বীপে মোবাইল চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে কি? উত্তর: জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ নেই, তবে নামার বাজারে কয়েকটি দোকানে সোলার বা জেনারেটরে মোবাইল চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা আছে, সামান্য ফি নেওয়া হয়। তবু পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখাই নিরাপদ।
