শনিবার, ১৭ অক্টোবর দুপুর। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ পোস্ট দিলেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। লক্ষ্য, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মাছরাঙা। কয়েক দিন আগে চ্যানেলটির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে বিকৃত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় কর্তৃপক্ষ যে দুঃখ-প্রকাশের ফটোকার্ড দিয়েছে, তাতে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট নন, এই পোস্টে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন সেকথা।
পোস্টে মাছরাঙা টেলিভিশনকে উদ্দেশ করে পরীমনি লিখেছেন, "আপনাদের এই জাস্ট একটা ফটোকার্ডের দুঃখ প্রকাশ কোনো কাজে দিচ্ছে না একদমই।" তাঁর ভাষ্য, একটি ঘটনার পর থেকে তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে, আর এই পরিস্থিতির সম্পূর্ণ দায় চ্যানেলটির।
কেন এতটা ক্ষুব্ধ তিনি, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন পোস্টে। পরীমনির অভিযোগ, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কাজ কিংবা ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়েই পোস্ট করতে পারছেন না তিনি। পোস্ট করলেই নেতিবাচক মন্তব্যের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে। তাঁর ভাষায়, "এমনকি আমার বাচ্চাদের ছবিও বাদ যাচ্ছে না হাজার হাজার হেটিং কমেন্টস থেকে।"
নিজের জীবনে এর প্রভাব তুলে ধরে পরীমনি আরও লিখেছেন, "এই যে আমার স্বাভাবিক জীবনটা এভাবে আবার দুর্বিষহ করে দিয়েছেন, এর সম্পূর্ণ দায়ভার আপনাদের।" মানসিক শান্তি নষ্ট হওয়া আর কাজের ক্ষতির কথাও জানিয়েছেন তিনি, "কী করবো বলেন এবার। আমার জীবনের মানসিক শান্তি নষ্ট করে দিলেন! আমার কাজ নষ্ট করে দিলেন। এরপর কী বাকি থাকলো আর?"
সবচেয়ে তীব্র অংশটি পোস্টের শেষ দিকে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার যে আশ্বাস মাছরাঙা দিয়েছিল, তার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে পরীমনি লিখেছেন, "আপনারা বলেছেন অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন। আর কবে আনবেন সেটা? আমার কাছে অপরাধী তো এখন আপনারা।" এই এক বাক্যই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৩ অক্টোবর, মঙ্গলবার। সেদিন মাছরাঙা টেলিভিশনের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে জনপ্রিয় দুই অভিনেত্রীর বিকৃত ভিডিওসহ পাঁচটি পোস্ট প্রকাশ করা হয়। বেলা ১১টা পর্যন্ত পোস্টগুলো অ্যাকাউন্টে দেখা গেছে। পরে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে এবং জানায়, তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হয়েছিল। এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ঘোষণাও দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
তবে হ্যাকড হওয়ার এই ব্যাখ্যা শুরু থেকেই প্রশ্নের মুখে। ঘটনার পরপরই পরীমনি ফেসবুক লাইভে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, 'পেজ হ্যাক হয়েছে বললেই হলো' ধরনের মন্তব্য করে। অর্থাৎ, শনিবারের এই পোস্ট কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া নয়, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা বিতর্কেরই নতুন ও সবচেয়ে তীব্র অধ্যায়।
এক নজরে পুরো টাইমলাইনটা এমন: ১৩ অক্টোবর মাছরাঙার ইনস্টাগ্রাম থেকে বিকৃত ভিডিওসহ পাঁচটি পোস্ট প্রকাশ, একই দিনে চ্যানেলের দুঃখ-প্রকাশের ফটোকার্ড ও হ্যাকড হওয়ার দাবি, তারপর পরীমনির ফেসবুক লাইভে ক্ষোভ, আর সবশেষে ১৭ অক্টোবর এই বিস্ফোরক পোস্ট। প্রতিটি ধাপেই বিতর্ক বড় হয়েছে, কমেনি।
পোস্টটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। জাগো নিউজ ২৪ ও বাংলা ট্রিবিউনের পাশাপাশি যুগান্তরও এই ঘটনার খবর প্রকাশ করেছে। ফলে এখন এটি আর শুধু একটি ফেসবুক পোস্ট নয়, জাতীয় বিনোদন-সংবাদের প্রধান আলোচ্যবিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এই ঘটনা শুধু একজন তারকার ব্যক্তিগত ক্ষোভের গল্প নয়। একটি টেলিভিশন চ্যানেলের অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকে বিকৃত ভিডিও ছড়িয়ে পড়া, আর তারপর 'হ্যাকড' ব্যাখ্যা দিয়ে একটি ফটোকার্ডে দুঃখ প্রকাশ, এই পুরো প্রক্রিয়া মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। ভুক্তভোগী যখন নিজেই বলছেন তাঁর মানসিক শান্তি ও কাজের ক্ষতি হয়েছে, তখন প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি আরও জরুরি হয়ে ওঠে।
এখন নজর মাছরাঙা টেলিভিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। জড়িতদের আইনের আওতায় আনার ঘোষণা তারা আগেই দিয়েছে, কিন্তু পরীমনির প্রশ্ন, আর কবে আনা হবে, সেই অগ্রগতির অপেক্ষায় এখন দর্শকও। অন্যদিকে পরীমনি নিজে আইনি পথে হাঁটবেন কিনা, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার, একটি ফটোকার্ডে এই বিতর্কের ইতি ঘটছে না।
