বিনোদন ঝলক
ভ্রমণ

রাতারগুল ভ্রমণ গাইড ২০২৬: বাংলার অ্যামাজনে নৌকা ভ্রমণ

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৭ অক্টোবর ২০২৬8 মিনিটে পড়ুন
রাতারগুল ভ্রমণ গাইড ২০২৬: বাংলার অ্যামাজনে নৌকা ভ্রমণ

ভূমিকা সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় গোয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত রাতারগুল বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির জলার বন, যাকে বলা হয় বাংলার অ্যামাজন। বর্ষাকালে এই বনের গাছগুলো কোমর থেকে গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকে, তখন ডিঙি নৌকায় বনের ভেতর দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা পৃথিবীর বিখ্যাত অ্যামাজন বনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। সিলেট শহর থেকে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে এই সোয়াম্প ফরেস্ট প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য গন্তব্য। এই গাইডে রাতারগুল ভ্রমণের সব তথ্য তুলে ধরা হলো।

কেন যাবেন রাতারগুল যাওয়ার কারণ এটি বাংলাদেশের বিরলতম প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলোর একটি। দেশে হাওর, পাহাড়, সমুদ্র অনেক আছে, কিন্তু পানিতে ডুবে থাকা বনের ভেতর দিয়ে নৌকায় ঘোরা, এই অভিজ্ঞতা শুধু রাতারগুলেই মেলে। বর্ষায় যখন বনের ভেতর পানি থাকে তখন গাছের সারির মাঝখান দিয়ে ডিঙি নৌকা চলার সময় মনে হয় আপনি ভাসছেন সবুজ সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে। গাছের ডালে বসে থাকা নানা প্রজাতির পাখি, পানিতে ভাসমান জলজ উদ্ভিদ আর নীরব বনের পরিবেশ মিলিয়ে এটি পাখি পর্যবেক্ষক ও ফটোগ্রাফারদের প্রিয় জায়গা। শীতকালে পানি কমে গেলে বনের অন্য রূপ দেখা যায়, তখন হেঁটে বনের ভেতরে ঢোকা যায়। যারা সিলেট ভ্রমণে একটু ভিন্নধর্মী প্রকৃতির স্বাদ পেতে চান, তাদের জন্য রাতারগুল অপরিহার্য।

কী কী দেখবেন রাতারগুলের মূল আকর্ষণ বনের ভেতরে ডিঙি নৌকায় ভ্রমণ। ঘাট থেকে নৌকায় উঠে প্রায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা বনের ভেতরের খাল ধরে ঘোরা যায়। এই সময়ে দেখা যায় হিজল, করচ, বরুণসহ জলসহিষ্ণু গাছের সারি, যাদের শিকড় পানির নিচে আর ডালপালা পানির ওপরে। বনের মাঝখানে আছে একটি ওয়াচ টাওয়ার, যেখান থেকে পুরো জলার বনের প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়। পাখি দেখার জন্য ভোরবেলা সেরা সময়, এখানে দেখা যায় বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ নানা প্রজাতির পাখি। বর্ষায় বনের ভেতরে পানির গভীরতা বেশি থাকে বলে নৌকা অনেক ভেতর পর্যন্ত যেতে পারে। ঘাট এলাকায় স্থানীয়দের জীবনযাত্রা, মাছ ধরার দৃশ্যও দেখার মতো। অনেকে রাতারগুলের সাথে একই দিনে ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর ঘুরে আসেন, কারণ দুটো জায়গা সিলেট শহর থেকে একই দিকেই।

রাতারগুলের জীববৈচিত্র্য রাতারগুল শুধু সুন্দর দৃশ্যের জন্যই নয়, এর জীববৈচিত্র্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই জলার বনে হিজল, করচ, বরুণ, পিটালি, জারুলসহ নানা প্রজাতির জলসহিষ্ণু গাছ আছে, যারা বছরের একটা বড় সময় পানির নিচে থেকেও বেঁচে থাকে। বর্ষায় এখানে মাছের প্রজনন হয়, শীতকালে আসে পরিযায়ী পাখি। বক, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ডাহুকসহ নানা পাখির দেখা মেলে। বনের ভেতরে সাপ ও বানরেরও দেখা পাওয়া যায় মাঝে মাঝে। এই সংবেদনশীল প্রতিবেশ রক্ষায় বন বিভাগ এলাকাটি সংরক্ষিত ঘোষণা করেছে। ভ্রমণকারী হিসেবে আমাদের উচিত বনের কোনো ক্ষতি না করা, পাখিদের বিরক্ত না করা আর ময়লা না ফেলা।

কীভাবে যাবেন রাতারগুল যেতে প্রথমে সিলেট শহরে পৌঁছাতে হবে। ঢাকা থেকে সিলেট বাসে নন এসিতে জনপ্রতি প্রায় ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা আর এসিতে প্রায় ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা, সময় লাগে প্রায় ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। ট্রেনে শোভন চেয়ারে ভাড়া প্রায় ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা। বিমানে সময় লাগে মাত্র ৪৫ মিনিট। সিলেট শহর থেকে রাতারগুলের দূরত্ব প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার।

সিলেট শহরের আম্বরখানা বা সাহেব বাজার এলাকা থেকে সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ করে রাতারগুল ঘাটে যাওয়া যায়, যাওয়া আসা মিলিয়ে ভাড়া পড়ে প্রায় ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা। সময় লাগে প্রায় ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। ঘাটে পৌঁছে সেখান থেকে ডিঙি নৌকা ভাড়া করতে হয়। একটি ডিঙি নৌকায় ৪ থেকে ৫ জন বসা যায়, ভাড়া প্রায় ৭৫০ থেকে ১০০০ টাকা, যা শেয়ার করে নিলে জনপ্রতি খরচ কমে। বন এলাকায় প্রবেশের জন্য টিকিট কাটতে হয়, জনপ্রতি প্রায় ৫০ থেকে ৬০ টাকা। নৌকার মাঝিরাই গাইডের কাজ করেন, বনের ভেতরের নিরাপদ রুট তারাই চেনেন।

খরচের ধারণা রাতারগুল দিনভ্রমণে ঢাকা থেকে ৪ থেকে ৫ জনের গ্রুপে গেলে জনপ্রতি খরচ হতে পারে প্রায় ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা। এর মধ্যে ঢাকা সিলেট যাওয়া আসার বাস ভাড়া, সিলেট থেকে রাতারগুল যাতায়াতের শেয়ার করা সিএনজি ভাড়া, নৌকা ভাড়ার শেয়ার, এন্ট্রি টিকিট আর খাওয়া অন্তর্ভুক্ত। সিলেটে এক রাত থাকলে হোটেল খরচ যোগ হবে প্রায় ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। যারা একদিনে রাতারগুল ও ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর দুটোই ঘুরতে চান তাদের গাড়ি ভাড়া কিছুটা বাড়বে, সারাদিনের সিএনজি রিজার্ভে খরচ হতে পারে প্রায় ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা। মনে রাখবেন, এই সব সংখ্যা শুধুই ধারণা দেওয়ার জন্য, ভ্রমণের আগে বাস কাউন্টার, নৌকা ঘাট ও হোটেলে বর্তমান ভাড়া যাচাই করে নিন।

কোথায় থাকবেন রাতারগুলে দিনভ্রমণই সবচেয়ে প্রচলিত, তাই বেশিরভাগ ভ্রমণকারী সিলেট শহরে থাকেন। সিলেট শহরের দরগা গেট, জিন্দাবাজার, আম্বরখানা ও তালতলা এলাকায় বাজেট থেকে মাঝারি মানের হোটেল পাওয়া যায় প্রায় ৫০০ থেকে ২৫০০ টাকায়। যারা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চান তাদের জন্য রাতারগুল এলাকায় কয়েকটি ইকো রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, যেখানে রাত কাটিয়ে ভোরে বনের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। তবে এই রিসোর্টগুলোর সংখ্যা সীমিত, তাই আগে থেকে বুকিং করে যাওয়া ভালো। ইকো রিসোর্টে থাকার খরচ সাধারণত শহরের হোটেলের চেয়ে কিছুটা বেশি হয়।

কী খাবেন রাতারগুল ঘাট এলাকায় বড় রেস্টুরেন্ট নেই, তবে স্থানীয় বাজারে সাধারণ ভাতের হোটেল পাওয়া যায় যেখানে দুপুরের খাবারে খরচ হয় জনপ্রতি প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। ভালো খাবারের জন্য সিলেট শহরে ফিরে খাওয়াই ভালো। জিন্দাবাজারের পানসি ও পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবারে জনপ্রতি খরচ প্রায় ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। সকালের নাস্তায় পরোটা, ডাল, ভাজি আর চা পাওয়া যায় প্রায় ৫০ থেকে ১০০ টাকায়। রাতারগুল ভ্রমণে সাথে পানি ও হালকা শুকনো খাবার রাখুন, কারণ বনের ভেতরে দোকানপাট নেই।

একদিনে রাতারগুল ও সাদা পাথর সিলেট ভ্রমণে সময় বাঁচাতে অনেকে একদিনে রাতারগুল ও ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর দুটোই ঘুরে আসেন। সকাল ৭টায় সিলেট থেকে রওনা দিয়ে প্রথমে রাতারগুল যান, সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত নৌকায় বন ঘুরুন। তারপর দুপুরের খাবার সেরে বিকেলে ভোলাগঞ্জ সাদা পাথরে যান, যেখানে ধলাই নদীর স্বচ্ছ পানি আর সাদা পাথরের স্তূপ দেখা যায়। সন্ধ্যার আগেই সিলেট ফেরা যায়। এই কম্বো ট্যুরের জন্য সারাদিনের সিএনজি রিজার্ভ নিন, ভাড়া পড়বে প্রায় ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা। তবে মনে রাখবেন, দুটো জায়গা একদিনে ঘুরলে প্রতিটিতে সময় কম পাবেন, তাই প্রকৃতি ধীরে উপভোগ করতে চাইলে আলাদা দিন রাখাই ভালো।

যাওয়ার সেরা সময় রাতারগুল ভ্রমণের সেরা সময় বর্ষাকাল, অর্থাৎ জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। এই সময় বনে পানি থাকে সর্বোচ্চ, গাছগুলো পানিতে ডুবে থাকে আর ডিঙি নৌকায় বনের গভীরে যাওয়া যায়। বর্ষার এই রূপই রাতারগুলকে বাংলার অ্যামাজন নাম দিয়েছে। শীতকালে, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে, পানি কমে যায়, তখন নৌকা বেশি ভেতরে যেতে পারে না, কিন্তু হেঁটে বনের ভেতরে ঢুকে গাছপালা কাছ থেকে দেখা যায়। পাখি দেখতে চাইলে শীতের ভোরবেলা ভালো সময়। বর্ষায় গেলে বৃষ্টির জন্য রেইনকোট বা ছাতা সাথে রাখুন।

টিপস ও সতর্কতা রাতারগুল একটি সংরক্ষিত বন এলাকা, তাই পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ সতর্ক থাকুন। প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট বা কোনো ময়লা বনে বা পানিতে ফেলবেন না, সাথে করে ফিরিয়ে আনুন। বনের ভেতরে জোরে শব্দ করবেন না, এতে পাখি ও বন্যপ্রাণী বিরক্ত হয়। নৌকায় ওঠার সময় ভিড় করবেন না আর মাঝির নির্দেশ মেনে বসুন। গাছের ডাল ভাঙা বা গাছে আঘাত করা থেকে বিরত থাকুন। সকাল সকাল রাতারগুল পৌঁছান, তখন ভিড় কম থাকে আর পাখি দেখার সুযোগ বেশি। বর্ষায় পানির গভীরতা বেশি থাকে, তাই সাঁতার না জানলে নৌকার কিনারায় বেশি ঝুঁকবেন না। স্থানীয় মাঝি ছাড়া বনের ভেতরে একা ঢুকবেন না, পথ হারানোর ঝুঁকি থাকে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা প্রশ্ন: রাতারগুলকে বাংলার অ্যামাজন বলা হয় কেন? উত্তর: বর্ষাকালে এই জলার বনের গাছপালা পানিতে ডুবে থাকে আর ডিঙি নৌকায় বনের ভেতর দিয়ে ঘোরা যায়, যা দক্ষিণ আমেরিকার অ্যামাজন বনের কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই মিল থেকেই এর নাম হয়েছে বাংলার অ্যামাজন। প্রশ্ন: রাতারগুলে কি সারা বছর পানি থাকে? উত্তর: না, বর্ষাকালে অর্থাৎ জুন থেকে অক্টোবরে বনে সবচেয়ে বেশি পানি থাকে। শীতকালে পানি অনেক কমে যায়, তখন নৌকা বনের বেশি ভেতরে যেতে পারে না, তবে হেঁটে বন ঘোরা যায়। প্রশ্ন: রাতারগুল ঘুরতে কত সময় লাগে? উত্তর: ঘাট থেকে নৌকায় বনের ভেতরে ঘুরতে সময় লাগে প্রায় ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। সিলেট শহর থেকে যাওয়া আসাসহ পুরো ট্রিপে একদিনই যথেষ্ট। প্রশ্ন: শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে কি রাতারগুল যাওয়া যায়? উত্তর: হ্যাঁ, যাওয়া যায়। ডিঙি নৌকা স্থির পানিতে চলে তাই ঝুঁকি কম। তবে শিশুদের নৌকায় বসিয়ে রাখুন আর কিনারায় ঝুঁকতে দেবেন না।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার