বিনোদন ঝলক
ভ্রমণ

সাদা পাথর ভ্রমণ গাইড ২০২৬: ভোলাগঞ্জের স্ফটিক জলে একদিন

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৭ অক্টোবর ২০২৬7 মিনিটে পড়ুন
সাদা পাথর ভ্রমণ গাইড ২০২৬: ভোলাগঞ্জের স্ফটিক জলে একদিন

ভূমিকা সিলেট শহর থেকে প্রায় ৩৩ থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জে ধলাই নদীর তীরে ছড়িয়ে আছে সাদা পাথর। বাংলাদেশ ভারত সীমান্তের জিরো লাইনের কাছে প্রায় ১৫ একর এলাকাজুড়ে ছোট বড় সাদা পাথরের বিছানা, সেই পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া কাঁচের মতো স্বচ্ছ পানি আর পেছনে মেঘালয়ের সবুজ খাসি পাহাড়ের সারি মিলিয়ে এই জায়গার দৃশ্য একবার দেখলে সহজে ভোলা যায় না। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে ধলাইয়ের স্রোতে ভেসে এসে জমেছে এই পাথরগুলো, প্রকৃতির নিজের হাতে সাজানো এক বিস্ময়। জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি আর লালাখাল ঘোরা হয়ে গেলে সিলেট ভ্রমণের পরের গন্তব্য হিসেবে সাদা পাথরের নাম আসে সবার আগে।

কেন যাবেন সাদা পাথর যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ এর অনন্য সাদা পাথরের বিছানা আর স্ফটিক স্বচ্ছ পানি। ধলাই নদীর পানি এতটাই পরিষ্কার যে পানির নিচের পাথর স্পষ্ট দেখা যায়, আর পাথরের ওপর বসে পায়ে পানি ছুঁইয়ে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা ভ্রমণকারীদের কাছে সত্যিই অমূল্য। পেছনে মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ের সারি আর পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা মেঘ মিলিয়ে দৃশ্যটি হয় ছবির মতো। জাফলংয়ের সঙ্গে এর মিল থাকলেও সাদা পাথরের বিস্তীর্ণ পাথরের চর আর খোলা প্রান্তর একে দিয়েছে আলাদা পরিচয়। ছবি তোলার শখ থাকলে এখানকার সকালের আলো আর স্বচ্ছ পানি হবে আপনার সেরা ক্যানভাস।

কী কী দেখবেন সাদা পাথরের মূল আকর্ষণ ধলাই নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা সাদা পাথরের বিস্তীর্ণ স্তূপ আর তার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ স্রোত। পাথরের ওপর হেঁটে বেড়ানো, পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকা আর পেছনের খাসি পাহাড়ের পটভূমিতে ছবি তোলা এখানকার মূল আনন্দ। কাছেই আছে ঐতিহাসিক ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে, ১৯৬৪ সালে নির্মিত এই রোপওয়ে ভোলাগঞ্জ থেকে ছাতক পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার পথ জুড়ে ছিল, একসময় পাথর পরিবহনে ব্যবহৃত এই স্থাপনা এখন ইতিহাসের সাক্ষী। দেখে আসতে পারেন ভোলাগঞ্জ ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন এলাকা। সময় থাকলে কাছাকাছি উৎমাছড়া আর তুরংছড়া ঝরনা ঘুরে আসা যায়। সীমান্তের জিরো লাইন দূর থেকে দেখা যায়, তবে নির্দিষ্ট পর্যটন এলাকার বাইরে যাওয়া উচিত নয়।

কীভাবে যাবেন ঢাকা থেকে সিলেটে বাস, ট্রেন বা বিমানে যাওয়া যায়। সিলেট শহর থেকে সাদা পাথর যাওয়ার মূল রুট আম্বরখানা বা মজুমদারী থেকে ভোলাগঞ্জ। এই পথে লোকাল বাসে জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ৭০ টাকা, সিএনজিতে জনপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। পাঁচ ছয়জনের দল হলে রিজার্ভ সিএনজি নেওয়া সুবিধাজনক, ভাড়া পড়ে ১,৩০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মতো। প্রাইভেট কার রিজার্ভ করলে খরচ ২,৮০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। বিকল্প একটি রুটে আম্বরখানা থেকে সিএনজিতে কোম্পানীগঞ্জের টুকের বাজার যাওয়া যায়, জনপ্রতি ভাড়া ১২০ থেকে ২৫০ টাকা, সেখানকার ঘাট থেকে ট্রলার রিজার্ভ করে প্রায় ৩০ মিনিটে পৌঁছানো যায় সাদা পাথর, ট্রলার ভাড়া ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকা। ভোলাগঞ্জের ১০ নম্বর নৌকা ঘাট থেকে সাদা পাথর যেতে ইঞ্জিন নৌকার যাওয়া আসা ভাড়া প্রায় ৮০০ টাকা, একটি নৌকায় আটজন বসা যায়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী জনপ্রতি প্রায় ১০০ টাকায়ও নৌকায় যাওয়া যায়।

সেরা সময় সাদা পাথর ঘোরার সেরা মৌসুম বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী সময়, জুন থেকে সেপ্টেম্বর। এই সময় ধলাই নদীতে পানি থাকে ভরপুর, পাথরের ওপর দিয়ে স্রোত বয়ে যাওয়ার দৃশ্য হয় সবচেয়ে মোহনীয়। কোনো কোনো সূত্রে মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়কে উপযুক্ত বলা হয়েছে। শরতেও সাদা পাথরের সৌন্দর্য থাকে চমৎকার, প্রথম আলোর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে শরতের সাদা পাথরের রূপের কথা উঠে এসেছে। শীতকালে পানি কমে যায়, নৌকা চলাচল বন্ধ থাকে, তখন পায়ে হেঁটে পাথরের চর ঘুরতে হয়। বর্ষায় গেলে মনে রাখবেন ধলাইয়ের স্রোত এই সময় তীব্র থাকে।

কোথায় থাকবেন সাদা পাথরে রাত্রিযাপনের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থার তথ্য পাওয়া যায়নি। সাধারণ রীতি হলো দিনভ্রমণ করে সিলেট শহরে ফিরে আসা। সিলেট শহরে সব বাজেটের হোটেল আছে, বাজেট হোটেল থেকে মাঝারি মানের হোটেল পর্যন্ত পছন্দ অনুযায়ী থাকা যায়। যারা ভোরে বের হয়ে সন্ধ্যার মধ্যে ফিরতে চান, তাদের জন্য দিনভ্রমণই সবচেয়ে সুবিধাজনক। আগে থেকে হোটেল বুকিং করে রাখলে ছুটির দিনে ঝামেলা এড়ানো যায়।

খাওয়া সাদা পাথর এলাকায় বড় রেস্তোরাঁর নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই, তাই শুকনো খাবার আর পর্যাপ্ত পানি সঙ্গে নিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নৌকা ঘাটের আশপাশে ছোট দোকান থাকে, সেখানে হালকা খাবার পাওয়া যেতে পারে। মূল খাওয়ার পরিকল্পনা সিলেট শহরে রাখুন, ফেরার পথে বা সন্ধ্যায় শহরের খাবারের দোকানে খাওয়া সুবিধাজনক। দলে গেলে খাবার ভাগ করে নিলে খরচও কমে।

খরচের ধারণা দলে ভাগ করে গেলে সিলেট থেকে সাদা পাথর দিনভ্রমণে জনপ্রতি বাজেট খরচ পড়ে প্রায় ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা। এর মধ্যে আছে সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জ যাতায়াত আর নৌকা ভাড়া ভাগ করে দেওয়া। মাঝারি বাজেটে রিজার্ভ গাড়ি আর ভালো খাওয়া মিলিয়ে জনপ্রতি খরচ হতে পারে ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা। মনে রাখবেন, ভাড়ার অঙ্ক মৌসুমভেদে বদলায়, ছুটির দিনে নৌকা ও গাড়ি ভাড়া বেশি হতে পারে। এই ধারণা ট্রাভেল ব্লগ ও স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে, আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা নয়, যাত্রার আগে স্থানীয়ভাবে ভাড়া জেনে নিন।

বাজেট টিপস খরচ কমাতে ছয় থেকে আটজনের দলে যান, তাহলে সিএনজি আর নৌকা ভাড়া ভাগ হয়ে জনপ্রতি খরচ অনেক কমে। রিজার্ভ নৌকার বদলে জনপ্রতি ভাড়ায় শেয়ার নৌকা পেলে সাশ্রয় হয়। সকাল সকাল বের হলে দিনের আলোয় পুরো এলাকা ঘুরে সন্ধ্যার আগেই ফেরা যায়, এতে থাকার খরচ বাঁচে। পানি আর হালকা খাবার সঙ্গে নিলে ঘাটের দোকানে বাড়তি খরচ এড়ানো যায়। সপ্তাহের কর্মদিবসে গেলে ভিড় কম থাকে, ভাড়াও তুলনামূলক কম পাওয়া যায়।

নিরাপত্তা পরামর্শ বর্ষাকালে ধলাই নদীর স্রোত তীব্র থাকে, তাই গভীর পানিতে নামা ঝুঁকিপূর্ণ। সাঁতার না জানলে পানিতে নামবেন না, শিশুদের সবসময় চোখে চোখে রাখুন। এটি সীমান্ত এলাকা, তাই নির্দিষ্ট পর্যটন এলাকার বাইরে যাবেন না, জিরো লাইনের দিকে এগোবেন না। ২০২৫ সালের আগস্টে সাদা পাথর এলাকায় ব্যাপক পাথর লুটপাটের ঘটনা ঘটে, এ নিয়ে মামলা ও পাথর উদ্ধার অভিযান চলে বলে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে খবর প্রকাশিত হয়। বর্তমান পরিস্থিতি এই গাইড লেখার সময় যাচাই করা যায়নি, তাই যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসন বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে এলাকার হাল জেনে নিন। মূল্যবান জিনিসপত্র নিরাপদে রাখুন, পাথরে হাঁটার সময় পিছলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে বলে ভালো গ্রিপের জুতা পরুন।

একদিনের ট্যুর প্ল্যান সাদা পাথর ঘোরার আদর্শ পরিকল্পনা হলো ভোরে সিলেট শহর থেকে বের হওয়া। সকাল ৭টার মধ্যে রওনা দিলে ৯টার আগেই ভোলাগঞ্জের নৌকা ঘাটে পৌঁছানো যায়, তখন ভিড়ও কম থাকে আর আলো থাকে ছবি তোলার জন্য সেরা। ঘাট থেকে নৌকায় সাদা পাথর পৌঁছে দুপুর পর্যন্ত পাথরের চর, স্বচ্ছ পানি আর খাসি পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করুন। দুপুরের খাবার সঙ্গে নেওয়া শুকনো খাবারে সেরে বিকেলে ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে এলাকা ঘুরে দেখুন। বিকেল ৪টার মধ্যে ফেরার নৌকা ধরলে সন্ধ্যার আগেই সিলেট শহরে ফেরা যায়। এভাবে পরিকল্পনা করলে একদিনেই পুরো অভিজ্ঞতা নেওয়া সম্ভব, থাকার খরচও বাঁচে।

কাদের জন্য সেরা বন্ধুদের দল নিয়ে ঘুরতে সাদা পাথরের জুড়ি নেই, নৌকা ভাড়া ভাগ করে নিলে খরচও কম পড়ে। পরিবার নিয়েও যাওয়া যায়, তবে শিশুদের পানির কাছে সতর্ক রাখতে হবে। ফটোগ্রাফারদের জন্য এটি সিলেটের অন্যতম সেরা লোকেশন, সাদা পাথর, স্বচ্ছ পানি আর পেছনের সবুজ পাহাড় মিলিয়ে প্রতিটি ফ্রেমই হয় অসাধারণ। যারা জাফলং ঘুরেছেন, তাদের জন্য সাদা পাথর হবে নতুন অভিজ্ঞতা, দুটি জায়গার চরিত্রে মিল থাকলেও সাদা পাথরের খোলা প্রান্তর আর বিস্তীর্ণ পাথরের বিছানা একে করেছে স্বতন্ত্র।

প্রশ্নোত্তর একদিনে ঘুরে আসা যায় কি? হ্যাঁ, সিলেট শহর থেকে দিনভ্রমণেই সাদা পাথর ভালোভাবে ঘোরা যায়। সকালে বের হয়ে বিকেলের মধ্যে ফেরা সম্ভব। পরিবার নিয়ে যাওয়া নিরাপদ কি? হ্যাঁ, তবে শিশু ও বয়স্কদের পানির কাছে সতর্ক থাকতে হবে, বর্ষায় স্রোতের দিকটা খেয়াল রাখুন। শীতকালে গেলে কী দেখব? শীতে পানি কম থাকে, নৌকা চলে না, তবে পাথরের বিস্তীর্ণ চর আর খাসি পাহাড়ের দৃশ্য তখনও উপভোগ্য। ছবি তোলার সেরা সময় কখন? সকালের নরম আলোয় পানির স্বচ্ছতা আর পাথরের সাদা রং সবচেয়ে ভালো ধরা পড়ে।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার