ঢাকার কোলাহল থেকে মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের দূরত্বে এমন এক জনপদ আছে, যেখানে পা রাখলেই মনে হয় সময় যেন কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও একসময় ছিল বাংলার রাজধানী, মসলিন বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র আর সুলতান, ভূঁইয়া আর বণিকদের আনাগোনায় মুখর এক সমৃদ্ধ নগরী। আর সেই সোনারগাঁওয়ের বুকেই দাঁড়িয়ে আছে পানাম নগর, যাকে অনেকে বলেন বাংলার হারানো নগরী।
একদিনের ছুটিতে ঘুরে আসার জন্য এর চেয়ে ভালো গন্তব্য বাংলাদেশে খুব কমই আছে। সকালে রওনা দিয়ে দুপুরের আগেই পৌঁছে যাওয়া যায়, বিকেলের মধ্যে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, বড় সর্দার বাড়ি আর পানাম নগরের অলিগলি ঘুরে সন্ধ্যার আগেই ঢাকায় ফেরা সম্ভব। খরচও হাতের নাগালে। এই গাইডে থাকছে সোনারগাঁও ও পানাম নগরের ইতিহাস, কী কী দেখবেন, কীভাবে যাবেন, কত খরচ হবে, কোথায় থাকবেন, কী খাবেন আর ভ্রমণের জরুরি টিপস।
কেন যাবেন
সোনারগাঁও নামের অর্থ সোনালি গ্রাম। প্রাচীনকাল থেকে এই অঞ্চল ছিল বঙ্গ, সমতট, সেন আর দেব বংশের শাসনাধীন গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। চতুর্দশ শতকে ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ ও তাঁর ছেলে ইখতিয়ারউদ্দীন গাজী শাহ এখানে স্বাধীন সোনারগাঁও সালতানাতের রাজধানী স্থাপন করেন। পরে গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের আমলে সোনারগাঁও হয় সমগ্র বাংলা সালতানাতের রাজধানী, বসে রাজদরবার, চালু হয় টাঁকশাল। অর্থাৎ আজকের ঢাকা রাজধানী হওয়ার বহু আগেই বাংলার শাসনকেন্দ্র ছিল এই সোনারগাঁও।
ষোড়শ শতকে বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁ সোনারগাঁওকে তাঁর ঘাঁটি বানান। মুঘল সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে তাঁর আর তাঁর ছেলে মুসা খাঁর প্রতিরোধের কেন্দ্র ছিল এই অঞ্চল। পাশাপাশি সোনারগাঁওয়ের পেছনের ভূমি ছিল মসলিন বস্ত্রের উৎপাদনকেন্দ্র, তাঁতী আর কারিগরে ভরপুর। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান বিবরণে উল্লিখিত বাণিজ্যকেন্দ্রের সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগসূত্রের কথাও প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলেন। ইতিহাসের এমন ঘন স্তর বাংলাদেশের খুব কম জায়গাতেই একসঙ্গে পাওয়া যায়।
আর পানাম নগর হলো সেই ইতিহাসের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায়। ধারণা করা হয়, পানাম এলাকা ত্রয়োদশ শতকের শেষ দিকে সোনারগাঁও রাজধানীর অংশ ছিল। পঞ্চদশ শতকে ঈসা খাঁ পানামকে তাঁর রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। প্রাচীন সোনারগাঁওয়ের তিনটি শহরের মধ্যে পানাম নগরকেই সবচেয়ে মনোরম বলা হতো। তবে আজ যে ৫২টি দোতলা তিনতলা ভবন সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো মূলত উনিশ শতকে ধনী হিন্দু বণিকদের তৈরি। সুলতানি, মুঘল, ব্রিটিশ আর ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের মিশেলে গড়া এই নগরী একসময় ছিল অভিজাত বণিকপাড়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে এটি রূপ নেয় নীরব ভূতুড়ে নগরীতে। ২০০৬ সালে ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ড পানাম নগরকে বিশ্বের ১০০ ঝুঁকিপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনার তালিকায় রাখে।
কী কী দেখবেন
ভ্রমণের শুরুটা হওয়া উচিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের জাদুঘর দিয়ে। এখানকার গ্যালারিতে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি আর কারুশিল্পের নানা নিদর্শন সাজানো। জাদুঘর কমপ্লেক্সের ভেতরেই আছে বড় সর্দার বাড়ি, জমিদার আমলের স্থাপত্যশৈলীর চমৎকার নমুনা। বাড়ির ভেতরে ঢুকতে আলাদা টিকিট লাগে, তবে ভেতরের কারুকাজ আর প্রশস্ত উঠান দেখার মতো।
জাদুঘর থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটা পথে পানাম নগর। রাস্তার দুই পাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ৫২টি ভবন, উত্তরে ৩১টি আর দক্ষিণে ২১টি। কোনোটার কেন্দ্রে বিশাল হলঘর, কোনোটায় ভেতরের উঠান। ভবনগুলোর গায়ে এখনো টিকে আছে টেরাকোটার অলংকরণ, খিলান, কার্নিশের নকশা। পুরো রাস্তাটা হেঁটে শেষ করতে ঘণ্টাখানেক লাগে, আর ছবি তোলার জন্য প্রতিটি মোড়ই নতুন ফ্রেম।
জাদুঘরের গ্যালারিতে নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প, বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসপত্র, লোকজ বাদ্যযন্ত্র আর গ্রামবাংলার দৈনন্দিন জীবনের নানা সামগ্রী সাজানো আছে। কমপ্লেক্সের ভেতরের কারুশিল্পের দোকান থেকে হাতে তৈরি স্যুভেনির কেনার সুযোগ আছে, যা স্থানীয় কারিগরদের সরাসরি সহায়তা করে। বছরের বিভিন্ন সময় এখানে লোকজ মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, মেলার মৌসুমে গেলে ভ্রমণটা আরও রঙিন হয়।
হাতে সময় থাকলে ঘুরে আসুন গোয়ালদি মসজিদ। পানাম থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তর পূর্বে এই এক গম্বুজ মসজিদটি ১৫১৯ সালে সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে মোল্লা হিজবর আকবর খান নির্মাণ করেন। সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম সুন্দর নমুনা এই মসজিদ ১৯৭৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংস্কার করে। পাশাপাশি দেখতে পারেন পানাম সেতু আর আশপাশের পুরোনো স্থাপনা।
কীভাবে যাবেন
বাসে: ঢাকার গুলিস্তান বা সায়েদাবাদ থেকে সোনারগাঁওগামী বাসে উঠে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় নামতে হবে। সরকারি পর্যটন পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী এই রুটে বাস ভাড়া ২৫ থেকে ৪৫ টাকা। মোগরাপাড়া থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় ২০ থেকে ৪০ টাকায় পৌঁছে যাবেন লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর বা পানাম নগরে। জাদুঘর থেকে পানাম নগর হাঁটা দূরত্বে, সময় লাগে ৫ থেকে ১০ মিনিট। যানজটের ওপর নির্ভর করে ঢাকা থেকে পুরো পথে ১ থেকে ২ ঘণ্টা লাগতে পারে।
ট্রেনে ও লঞ্চে: সরাসরি ট্রেনে সোনারগাঁও যাওয়া যায় না। তবে কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জগামী লোকাল ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ গিয়ে সেখান থেকে বাস বা সিএনজিতে সোনারগাঁও যাওয়া যায়। একইভাবে সদরঘাট থেকে লঞ্চে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছে স্থানীয় যানবাহনে যাওয়ার বিকল্পও আছে। তবে সময় বাঁচাতে সরাসরি বাসই সবচেয়ে সুবিধাজনক।
ব্যক্তিগত গাড়িতে: ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা পর্যন্ত গিয়ে স্থানীয় সাইনবোর্ড দেখে জাদুঘর বা পানাম নগরের দিকে ঢুকতে হবে। নিজের গাড়ি থাকলে যানজট এড়াতে সকাল ৭টার মধ্যে ঢাকা ছাড়াই ভালো।
খরচের ধারণা
একদিনের ট্যুরে জনপ্রতি খরচ পড়ে প্রায় ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা। হিসাবটা এরকম: ঢাকা থেকে মোগরাপাড়া বাসে যাওয়া আসা প্রায় ১১০ টাকা, মোগরাপাড়া থেকে রিকশা বা অটোতে ২০ থেকে ৪০ টাকা, পানাম নগরের টিকিট ১৫ থেকে ৩০ টাকা, লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের মূল কমপ্লেক্সের টিকিট ৫০ টাকা আর বড় সর্দার বাড়ির ভেতরে ঢুকতে চাইলে আরও ১০০ টাকা। দুপুরের খাবারে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা ধরলে মোট ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যেই দিনটা শেষ করা যায়।
মনে রাখবেন, টিকিটের মূল্য আর যাতায়াত ভাড়া সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। ভ্রমণের আগে যাচাই করে নিন। বিশেষ করে জাদুঘরের সময়সূচি মাঝেমধ্যে বদলায়, তাই যাওয়ার আগের দিন ফাউন্ডেশনের হালনাগাদ তথ্য দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
কোথায় থাকবেন
সোনারগাঁও ও পানাম নগর একদিনেই ঘুরে ফেরা যায়, তাই রাত্রিযাপনের দরকার পড়ে না। সকালে রওনা দিয়ে বিকেল বা সন্ধ্যার মধ্যে ঢাকায় ফেরাই সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিকল্পনা। তবে কেউ চাইলে নারায়ণগঞ্জ শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল আছে, সেখানে রাত কাটিয়ে পরদিন আশপাশের আরও দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে পারেন।
কী খাবেন
জাদুঘর ও পানাম নগর এলাকায় স্থানীয় হোটেল ও খাবারের দোকান আছে। দুপুরে ভাত, মাছ, মাংস বা মোরগ পোলাওয়ের মতো সাধারণ বাঙালি খাবার সহজেই পাবেন, দামও নাগালের মধ্যে। মোগরাপাড়া বাজারের আশপাশে চা, সিঙ্গারা, পুরির দোকান আছে, হাঁটাহাঁটির ফাঁকে সেগুলো চেখে দেখতে পারেন। সঙ্গে খাবার পানি রাখুন, কারণ দুই জায়গা মিলিয়ে বেশ হাঁটতে হয়।
যাওয়ার সেরা সময়
সোনারগাঁও যাওয়ার সেরা সময় শীতকাল, অর্থাৎ অক্টোবর থেকে মার্চ। এই সময় আবহাওয়া শুষ্ক আর আরামদায়ক থাকে, পুরোনো ভবনের অলিগলিতে হাঁটতে কষ্ট হয় না। বর্ষায় পানাম নগরের কিছু অংশ পিচ্ছিল হয়, আর গ্রীষ্মের দুপুরের রোদে খোলা রাস্তায় হাঁটা কষ্টকর। শীতের সকালে নরম রোদে পানাম নগরের ছবি তোলার জন্যও এই সময়টাই সেরা।
টিপস ও সতর্কতা
দুই জায়গাই ঘুরতে বেশ হাঁটতে হয়, তাই আরামদায়ক জুতা পরুন আর সঙ্গে পানি ও হালকা খাবার রাখুন। পানাম নগরের কিছু পুরোনো ভবন ঝুঁকিপূর্ণ, কর্তৃপক্ষ যেখানে যেতে নিষেধ করেছে সেখানে যাবেন না। ঐতিহাসিক স্থাপনার দেয়ালে লেখা, ইট খোলা বা কোনো নিদর্শনের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন, এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সাপ্তাহিক বন্ধের দিন মাথায় রেখে পরিকল্পনা করুন, জাদুঘর বৃহস্পতিবার আর পানাম নগর রবিবার বন্ধ থাকে। আর ভিড় এড়াতে সরকারি ছুটির দিনের বদলে সাধারণ কর্মদিবসে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
ছবি তোলার শখ থাকলে সকালের নরম আলোয় পানাম নগরে যান, দুপুরের কড়া রোদে পুরোনো ভবনের ছবি ভালো আসে না। ভবনের ভেতরে ফ্ল্যাশ ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন, আর ড্রোন ওড়ানোর আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিন। সঙ্গে পাওয়ার ব্যাংক রাখুন, কারণ সারাদিন ছবি তুলতে তুলতে ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যেতে পারে।
সাপ্তাহিক বন্ধের দিন মাথায় রেখে পরিকল্পনা করুন, জাদুঘর বৃহস্পতিবার আর পানাম নগর রবিবার বন্ধ থাকে। আর ভিড় এড়াতে সরকারি ছুটির দিনের বদলে সাধারণ কর্মদিবসে যাওয়ার চেষ্টা করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: একদিনে সোনারগাঁও ও পানাম নগর দুটোই ঘোরা সম্ভব? উত্তর: হ্যাঁ, দুই জায়গার দূরত্ব খুব কম। সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে প্রথমে লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর, তারপর দুপুরের পর পানাম নগর ঘুরে বিকেলের মধ্যে শেষ করা যায়। হাতে সময় থাকলে গোয়ালদি মসজিদও দেখে নিতে পারেন।
প্রশ্ন: পানাম নগরে প্রবেশ টিকিট কত? উত্তর: বাংলাদেশি দর্শনার্থীদের জন্য টিকিট ১৫ থেকে ৩০ টাকা। সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ১০০ টাকা আর অন্যান্য বিদেশিদের জন্য ২০০ টাকা। ভ্রমণের আগে হালনাগাদ মূল্য যাচাই করে নিন।
প্রশ্ন: জাদুঘর কখন খোলা থাকে? উত্তর: ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বিশেষ সময়সূচি চলছে। নিয়মিত শীতকালীন সময়সূচি সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা, সাপ্তাহিক বন্ধ বৃহস্পতিবার। যাওয়ার আগে বর্তমান সময়সূচি নিশ্চিত করে নিন।
প্রশ্ন: পরিবার নিয়ে যাওয়া কি নিরাপদ? উত্তর: হ্যাঁ, দিনের বেলায় পরিবার নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে বয়স্ক ও শিশুদের জন্য হাঁটার পরিমাণটা মাথায় রাখুন, আর পানাম নগরের ভেতরে শিশুদের হাত ধরে রাখুন।
