আজ ১৮ অক্টোবর। এই দিনে আট বছর আগে চিরবিদায় নিয়েছিলেন বাংলা ব্যান্ডসংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ আইয়ুব বাচ্চু। তাঁকে হারানোর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। শারীরিকভাবে তিনি না থাকলেও গান, সুর আর গিটারের জাদুতে তিনি আজও বেঁচে আছেন অসংখ্য ভক্তের হৃদয়ে।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে চিরবিদায় নেন তিনি। শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী জন্মশহর চট্টগ্রামের চৈতন্য গলির কবরস্থানে মায়ের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী। জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিশোর বয়সে বন্ধুদের নিয়ে গড়া ব্যান্ডে গিটার বাজাতেন তিনি; এরপর 'সোলস' ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংগীতজগতে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। ১৯৯১ সালে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন 'লাভ রান্স ব্লাইন্ড' বা 'এলআরবি', যার মাধ্যমে বাংলা রকসংগীতে তৈরি করেন সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি পরিচয়। আরটিভির প্রতিবেদনে আরেকটি ধারাবাহিক ইতিহাস উঠে এসেছে: ১৯৭৮ সালে 'ফিলিংস' ব্যান্ডের মাধ্যমে তাঁর সংগীতযাত্রা শুরু, ১৯৮০ থেকে এক দশক তিনি ছিলেন সোলসের প্রধান গিটারিস্ট, আর ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন এলআরবি।
গায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জনের পাশাপাশি গিটারবাদক হিসেবেও হয়ে ওঠেন অনন্য। 'রুপালি গিটার' তাঁর হাতেই পরিণত হয়েছিল কিংবদন্তিতে। 'ফেরারি এই মনটা আমার', 'মা', 'বাংলাদেশ', 'ঘুম ভাঙা শহরে', 'হকার', 'উড়াল দেবো আকাশে', 'কষ্ট পেতে ভালোবাসি', 'সেই তুমি কেন এতো অচেনা হলে', 'আম্মাজান', এমন অসংখ্য গান এখনো শ্রোতাদের মাতিয়ে রাখে, ফিরিয়ে আনে আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতি। ক্যারিয়ারে তিনি একাধারে ব্যান্ডের রক, মেলোডি আর চলচ্চিত্রের অসংখ্য গান উপহার দিয়েছেন।
প্রয়াণের অষ্টম বার্ষিকীতে 'এবিকে'কে স্মরণ করবে তাঁর জন্মশহর চট্টগ্রামের মানুষ। পরিবারের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নগরীর ফিরিঙ্গীবাজার মসজিদে মাগরিবের নামাজের পর এই মাহফিল হবে, যেখানে সবার উপস্থিতি কামনা করেছে এবির পরিবার।
বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতকে জনপ্রিয় ও সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে যাঁরা ব্যান্ডধারাকে দেশের মাটিতে দাঁড় করিয়েছিলেন, তিনি তাঁদের অগ্রগামীদের একজন। গিটার তাঁর কাছে ছিল শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, বরং প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার মাধ্যম।
আট বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর সৃষ্টি ও সংগীতের আবেদন এতটুকু কমেনি। যে কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম, যে গিটারের সুরে কেঁপে উঠত কনসার্টের মঞ্চ, সেই শিল্পী আজও জীবন্ত তাঁর গানে।
প্রয়াণের আট বছর পরও তাঁর গান নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয়। ব্যান্ডসংগীতের যে ধারাকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছিলেন, সেখানেই আজকের অনেক তরুণ শিল্পীর অনুপ্রেরণার উৎস। গায়ক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন দর্শকপ্রিয়, গিটারবাদক হিসেবেও ছিলেন অনন্য; দুই পরিচয়ের এই সমন্বয়ই তাঁকে করে তুলেছিল বাংলা গানের ইতিহাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক নাম।
আইয়ুব বাচ্চুর মতো শিল্পীরা চলে গেলেও রেখে যান একটি সম্পূর্ণ ধারা। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীত আজ যা কিছু অর্জন করেছে, তার ভিত্তিতে রয়েছে এলআরবি ও তাঁর সমসাময়িকদের সেই সংগ্রামের যুগ। তাই অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী শুধু শোকের দিন নয়, একটি প্রজন্মের সংগীতযাত্রাকে নতুন করে মূল্যায়ন করার দিনও।
