বাংলাদেশের যে কটি স্থাপনা দেখে গর্বে বুক ভরে ওঠে, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ তার শীর্ষে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ইটের তৈরি এক বিশাল প্রাসাদ, কাছে গেলে চোখে পড়ে সারি সারি গম্বুজের অপূর্ব সমারোহ। মজার ব্যাপার হলো, নামে ষাট গম্বুজ হলেও এই মসজিদের গম্বুজ আসলে ৮১টি। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এই মসজিদসহ বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ নগরীকে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে।
খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলা শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে এই মসজিদ। ঢাকা থেকে এক রাতের বাসযাত্রায় পৌঁছে একদিনেই মসজিদ, জাদুঘর, খান জাহান আলীর মাজারসহ আশপাশের সব ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখা যায়। এই গাইডে থাকছে ষাট গম্বুজ মসজিদের ইতিহাস, কী কী দেখবেন, কীভাবে যাবেন, কত খরচ হবে, কোথায় থাকবেন, কী খাবেন আর জরুরি টিপস।
কেন যাবেন
পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সুন্দরবনের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনে এক মুসলিম জনবসতি গড়ে তোলেন সাধক ও সেনাপতি খান জাহান আলী। তুর্কি বংশোদ্ভূত এই মহান ব্যক্তি সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের আমলে খলিফাতাবাদ নামে এক সমৃদ্ধ শহর প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজকের বাগেরহাট। শুধু মসজিদই নয়, তিনি খনন করেন অসংখ্য দিঘি, গড়েন মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট। তাঁর তৈরি এক ডজনের বেশি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আজও বাগেরহাটজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
এই স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মহিমান্বিত হলো ষাট গম্বুজ মসজিদ। ধারণা করা হয়, খান জাহান আলীর জীবদ্দশায় ১৪৪২ সালে এর নির্মাণ শুরু হয়ে ১৪৫৯ সালে শেষ হয়। এটি বাংলা সুলতানি আমলের সবচেয়ে বড় মসজিদ। শুধু নামাজের জন্যই নয়, মসজিদটি মাদ্রাসা ও সভাঘর হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তুঘলক স্থাপত্যশৈলীর পুরু ইটের দেয়াল আর কুঁড়েঘর আকৃতির ছাদের রেখা একে দিয়েছে অনন্য চরিত্র। ইতিহাসবিদরা একে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম চমকপ্রদ মুসলিম স্থাপত্য বলে বর্ণনা করেছেন।
গম্বুজের হিসাবটা জেনে রাখা মজার। মূল প্রার্থনা কক্ষের ওপরে ৭ সারিতে ১১টি করে ৭৭টি নিচু গম্বুজ, আর চার কোণার টাওয়ারে ৪টি, মোট ৮১টি। ভেতরে ৬০টি পাথরের স্তম্ভ ছাদ ধরে রেখেছে, অনেকের মতে এই ৬০ স্তম্ভ থেকেই ষাট গম্বুজ নামের উৎপত্তি। মসজিদের দৈর্ঘ্য ১৬০ ফুট আর প্রস্থ ১০৮ ফুট। পূর্ব দেয়ালে ১১টি খিলান দরজা, উত্তর দক্ষিণে ৭টি করে। প্রায় ছয় শতাব্দী পরেও এখানে নিয়মিত নামাজ হয়, যা এই স্থাপনাকে শুধু জাদুঘর নয়, জীবন্ত ঐতিহ্যে পরিণত করেছে।
কী কী দেখবেন
ভ্রমণের কেন্দ্র অবশ্যই ষাট গম্বুজ মসজিদ। ভেতরে ঢুকে ৬০টি স্তম্ভের সারি আর ওপরের গম্বুজগুলোর নিচে দাঁড়ালে সুলতানি আমলের প্রকৌশলবিদ্যার পরিচয় পাওয়া যায়। সংরক্ষণের জন্য স্তম্ভগুলোতে চুন সুরকির প্রলেপ দেওয়া হলেও উত্তর পাশের একটি স্তম্ভ দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রাখা হয়েছে, যাতে আসল পাথর দেখা যায়।
মসজিদের দক্ষিণ পূর্ব কোণে বাগেরহাট জাদুঘর। ইউনেস্কো ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে এর নির্মাণ শুরু হয়ে ২০০১ সালে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। তিনটি গ্যালারিতে বাগেরহাট অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, মুদ্রা, তৈজসপত্র, মানচিত্র আর লিপিবদ্ধ ইতিহাস সাজানো। জাদুঘরের বিশেষ আকর্ষণ খান জাহান আলীর ঐতিহাসিক কুমিরের মমি।
মসজিদ থেকে ইজিবাইকে অল্প দূরত্বে হজরত খান জাহান আলীর মাজার শরীফ ও ঠাকুর দিঘি। মাজার প্রাঙ্গণে প্রতিদিন অসংখ্য ভক্তের সমাগম হয়। মাজারের পাশের দিঘিতে কুমির দেখার জন্য দর্শনার্থীরা ভিড় করেন, স্থানীয়দের বিশ্বাস এই কুমিরগুলো খান জাহান আলীর স্মৃতিবাহী। মাজার এলাকা টিকিট ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছে।
মসজিদ নগরীর আরেক ঐতিহ্য খান জাহান আলীর খনন করা বিশাল দিঘিগুলো। ঠাকুর দিঘি, ঘোড়া দিঘি আর খাঞ্জালীর দিঘি আজও টিকে আছে, দিঘির পাড়ে বসে বিকেল কাটানো ভ্রমণকারীদের প্রিয় অভ্যাস। জনকল্যাণে দিঘি খনন ছিল খান জাহান আলীর শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, মসজিদের পাশাপাশি এই দিঘিগুলোও তাঁর দূরদর্শী পরিকল্পনার সাক্ষ্য দেয়।
আশপাশে আরও দেখুন নয় গম্বুজ মসজিদ, সিঙ্গাইর মসজিদ, চুনাখোলা মসজিদ, বিবি বেগনী মসজিদ, রণবিজয়পুর মসজিদ আর জিন্দাপীর মসজিদ। নয় গম্বুজ মসজিদের ভেতরের একটি স্তম্ভের গর্তকে অনেকে খান জাহান আলীর বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ বলে বিশ্বাস করেন। একদিনে ইজিবাইক বা ভ্যান ভাড়া করে এই সবগুলো স্থান ঘুরে দেখা সম্ভব।
কীভাবে যাবেন
বাসে: ঢাকার সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ১০টা এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বাগেরহাটগামী বাস ছাড়ে। মেঘনা, বনফুল, ফাল্গুনী, দোলা, পর্যটক পরিবহনের বাস এই রুটে চলে। গাবতলী থেকেও হানিফ, সোহাগ, সাকুরাসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাস পাবেন। ভাড়া জনপ্রতি ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকা। বাগেরহাট বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ টাকা রিকশা ভাড়ায় ষাট গম্বুজ মসজিদে যাওয়া যায়।
খুলনা হয়ে: খুলনা থেকে বাগেরহাট যাওয়া আরও সহজ। খুলনার সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাগেরহাটের বাস ভাড়া প্রায় ১০০ টাকা, সময় লাগে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। খুলনা শহর ঘুরে একদিনে বাগেরহাটের সব ঐতিহাসিক স্থান দেখে ফেরা যায়, অনেক ভ্রমণকারী এই পরিকল্পনাই করেন।
ট্রেনে: ঢাকা থেকে সরাসরি বাগেরহাটের ট্রেন নেই। তবে ঢাকা থেকে খুলনাগামী আন্তঃনগর ট্রেনে খুলনা গিয়ে সেখান থেকে বাস বা সিএনজিতে ষাট গম্বুজ মসজিদ যেতে পারেন। লঞ্চে সরাসরি বাগেরহাট যাওয়ার ব্যবস্থা নেই, তাই বাসই সবচেয়ে সুবিধাজনক।
খরচের ধারণা
বাগেরহাট ভ্রমণে প্রধান খরচ যাতায়াত। ঢাকা থেকে যাওয়া আসায় বাস ভাড়া ১৩০০ থেকে ১৬০০ টাকা। ষাট গম্বুজ মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ টিকিট জনপ্রতি ৩০ টাকা, সার্কভুক্ত বিদেশিদের জন্য ২০০ টাকা আর অন্যান্য বিদেশিদের জন্য ৫০০ টাকা। ১০ বছরের কম বয়সী শিশু ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রবেশ ফ্রি। বাগেরহাট জাদুঘরের টিকিট ৩০ টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে myGOV ওয়েবসাইটে কিউআর কোডযুক্ত অনলাইন টিকিট চালু হয়েছে, লাইনে না দাঁড়িয়েই টিকিট কাটা যায়।
স্থানীয় যাতায়াতে ইজিবাইক বা ভ্যানে ১০ থেকে ৪০ টাকা করে গন্তব্য ভেদে খরচ হয়। খাওয়া আর এক রাত থাকা মিলিয়ে ঢাকা থেকে দুই দিনের ট্যুরে জনপ্রতি প্রায় ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা বাজেট রাখাই নিরাপদ। মনে রাখবেন, ভাড়া ও টিকিটের মূল্য পরিবর্তন হতে পারে, ভ্রমণের আগে যাচাই করে নিন।
কোথায় থাকবেন
বাগেরহাট শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল আছে, রাত কাটানোর জন্য সেগুলোই যথেষ্ট। তবে হোটেলের মান ও অপশন বেশি চাইলে খুলনা শহরে থাকা ভালো, সেখান থেকে সকালে রওনা দিয়ে দিনে দিনে বাগেরহাট ঘুরে ফেরা যায়। দল বেঁধে গেলে খুলনায় থাকার খরচ ভাগ করে নেওয়া সুবিধাজনক। অগ্রিম বুকিং না থাকলে শীত মৌসুমের ছুটির দিনে হোটেল পেতে কষ্ট হতে পারে, তাই আগে থেকে খোঁজ নিয়ে যান।
কী খাবেন
বাগেরহাট শহরের হোটেলগুলোতে ভাত, মাছ, মাংসসহ সাধারণ বাঙালি খাবার পাবেন। খুলনা অঞ্চলের বিখ্যাত চুইঝাল দিয়ে রান্না মাংসের স্বাদ নিতে ভুলবেন না, ঝালপ্রেমীদের জন্য এটা বিশেষ আকর্ষণ। মাজার এলাকার আশপাশে স্থানীয় খাবারের দোকানে সকালের নাস্তা সেরে নিতে পারেন। দক্ষিণাঞ্চলের নদীর মাছের স্বাদও চেখে দেখার মতো। সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি রাখুন, শীতকালেও দুপুরে ঘোরাঘুরিতে তৃষ্ণা পায়।
যাওয়ার সেরা সময়
বাগেরহাট যাওয়ার সেরা সময় শীতকাল, অক্টোবর থেকে মার্চ। এই সময় আবহাওয়া শুষ্ক থাকে, মসজিদ প্রাঙ্গণে হাঁটতে আরাম লাগে। বর্ষায় দক্ষিণাঞ্চলের রাস্তাঘাটে পানি জমতে পারে, আর গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে খোলা প্রাঙ্গণে ঘোরা কষ্টকর। শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে গম্বুজগুলোর ছবি তোলার অভিজ্ঞতাও অসাধারণ।
টিপস ও সতর্কতা
মসজিদে প্রবেশের সময় শালীন পোশাক পরুন, জুতা খুলে ভেতরে ঢুকুন। মনে রাখবেন, নামাজের জন্য টিকিট ছাড়াই মসজিদে প্রবেশ করা যায়, তবে দর্শনার্থী হিসেবে ঘুরতে টিকিট লাগে। শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত জুমার নামাজের জন্য প্রাঙ্গণ বন্ধ থাকে, আর রবিবার পূর্ণ দিবস বন্ধ। সোমবার খোলে বেলা ২টা থেকে। একদিনে সব মসজিদ ঘুরতে ইজিবাইক রিজার্ভ করে নিন, ভাড়া আগে ঠিক করে নিন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে হাত দেওয়া বা ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন।
ভোরে বা শেষ বিকেলে মসজিদের ছবি সবচেয়ে ভালো আসে, দুপুরের কড়া রোদে লাল ইটের রং ফিকে দেখায়। ভেতরের স্তম্ভের সারির ছবি তুলতে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ভালো কাজে লাগে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: ষাট গম্বুজ মসজিদে কি সত্যিই ৬০টি গম্বুজ আছে? উত্তর: না, নামে ষাট গম্বুজ হলেও গম্বুজ আছে ৮১টি। মূল কক্ষের ওপরে ৭৭টি আর চার কোণার টাওয়ারে ৪টি। ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ আছে, সেখান থেকেই নামের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।
প্রশ্ন: মসজিদে প্রবেশ টিকিট কত? উত্তর: বাংলাদেশিদের জন্য ৩০ টাকা, সার্কভুক্ত বিদেশিদের জন্য ২০০ টাকা, অন্যান্য বিদেশিদের জন্য ৫০০ টাকা। শিশু ও প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ফ্রি। myGOV থেকে অনলাইন টিকিটও কাটা যায়।
প্রশ্ন: একদিনে কি সব দেখা সম্ভব? উত্তর: হ্যাঁ, খুলনা বা বাগেরহাট থেকে সকালে রওনা দিলে ষাট গম্বুজ মসজিদ, জাদুঘর, খান জাহান আলীর মাজার, নয় গম্বুজ, সিঙ্গাইরসহ প্রধান সব স্থান একদিনেই ঘোরা যায়।
প্রশ্ন: নামাজের সময় কি মসজিদ বন্ধ থাকে? উত্তর: না, নামাজের জন্য মসজিদ খোলা থাকে এবং নামাজ পড়তে টিকিট লাগে না। তবে শুক্রবার জুমার সময় দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য প্রাঙ্গণ বন্ধ থাকে।
