বিনোদন ঝলক
ভ্রমণ

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ভ্রমণ গাইড ২০২৬: সোমপুর মহাবিহারের ইতিহাস ও ট্যুর প্ল্যান

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৭ অক্টোবর ২০২৬8 মিনিটে পড়ুন
পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ভ্রমণ গাইড ২০২৬: সোমপুর মহাবিহারের ইতিহাস ও ট্যুর প্ল্যান

নওগাঁর পাহাড়পুরে দাঁড়িয়ে আছে বাংলার সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর একটি। লাল ইটের বিশাল মন্দির, চারপাশে ১৭৭টি ভিক্ষুকক্ষের সারি, দেয়ালজুড়ে টেরাকোটার ভাস্কর্য। প্রায় ২৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত সোমপুর মহাবিহার হিমালয়ের দক্ষিণে সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে।

বারো শতাব্দী আগে এখানে বসে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা দর্শন, যুক্তিবিদ্যা আর চিকিৎসাশাস্ত্র চর্চা করতেন। নালন্দা আর বিক্রমশীলার সঙ্গে এই বিহারের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, অনেকটা আজকের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতার মতো। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য পাহাড়পুর শুধু দর্শনীয় স্থান নয়, প্রাচীন বাংলার জ্ঞানচর্চার জীবন্ত সাক্ষ্য। এই গাইডে থাকছে বিহারের ইতিহাস, কী কী দেখবেন, কীভাবে যাবেন, খরচ, থাকা, খাওয়া আর টিপস।

কেন যাবেন

অষ্টম শতকে পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল সোমপুর মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। পাল আমল ছিল বাংলায় বৌদ্ধধর্মের স্বর্ণযুগ, আর সোমপুর ছিল সেই যুগের সবচেয়ে বড় শিক্ষাকেন্দ্র। এখানে মহাযান, থেরবাদ আর বজ্রযান, তিন ধারার বৌদ্ধদর্শনই চর্চা হতো। তিব্বতি ঐতিহাসিক সূত্রে এই বিহারের উল্লেখ আছে, যা থেকে বোঝা যায় হিমালয় পেরিয়েও এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল।

বিহারের স্থাপত্যশৈলীও অভূতপূর্ব। কেন্দ্রস্থলের বিশাল মন্দিরটি ক্রুশাকার ভিত্তির ওপর নির্মিত, প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১০৮ মিটার। কেন্দ্রে দরজা জানালাবিহীন শূন্যগর্ভ চতুষ্কোণ প্রকোষ্ঠ, যা তলা থেকে চূড়া পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমানে মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ২১ মিটার, তবে ধারণা করা হয় একসময় তা ৩০ মিটারেরও বেশি ছিল। মন্দিরের দেয়ালে টেরাকোটার অলংকরণে ফুটে উঠেছে রামায়ণ, মহাভারত আর বৌদ্ধ জাতকের কাহিনি।

বিহারের পতনের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস জানা যায় না। ধারণা করা হয়, বৌদ্ধ শাসনের পতন, হিন্দুপ্রধান সেন বংশের উত্থান আর পরবর্তীতে মুসলিম বিজয়ের ফলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এটি ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে প্রায় ৮০০ বছর আগে পরিত্যক্ত হয়। মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা এই সভ্যতা ১৯২০ ও ৩০-এর দশকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আবার আলোয় আসে।

খননের পর বিহারের আসল রূপ দেখে প্রত্নতাত্ত্বিকরা বিস্মিত হয়েছিলেন। মন্দিরের ভিত্তি এতটাই সুবিন্যস্ত যে আধুনিক প্রকৌশলীরাও এর পরিকল্পনার প্রশংসা করেন। চারপাশের কক্ষগুলোর মেঝেতে পাওয়া গেছে পোড়ামাটির নকশা করা ইট, দেয়ালে চুন-সুরকির প্রলেপের চিহ্ন। পুরো চত্বরটা হেঁটে দেখতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় নিন, তাড়াহুড়ো করলে এই বিশালতার আসল অনুভূতি পাওয়া যায় না।

শেষ বিকেলে যখন লালচে ইটের গায়ে সোনালি রোদ পড়ে, তখন এই হারানো সভ্যতার গল্প যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

কী কী দেখবেন

ভ্রমণের শুরু কেন্দ্রীয় মন্দির দিয়ে। ক্রুশাকার মন্দিরের চারপাশে হেঁটে টেরাকোটা ফলকগুলো দেখুন, প্রতিটি ফলকে আলাদা গল্প। দুই হাজারের বেশি টেরাকোটা ফলক এখানে পাওয়া গেছে, যা প্রাচীন বাংলার শিল্পকলার অমূল্য ভান্ডার। মন্দিরের চূড়ায় ওঠা নিষেধ, তবে চারপাশের চত্বর থেকে পুরো কমপ্লেক্সের বিস্তার চোখে পড়ে।

মন্দির ঘিরে ১৭৭টি ভিক্ষুকক্ষের সারি। উত্তর পাশে এক সারিতে ৪৫টি, বাকি তিন পাশে ৪৪টি করে কক্ষ। এই কক্ষগুলোতে একসময় তান্ত্রিক সাধক ও শিক্ষার্থী ভিক্ষুরা থাকতেন। কক্ষগুলোর ভেতরে ঢুকে কল্পনা করুন, বারো শতাব্দী আগে এখানে কেমন জীবন ছিল।

বিহার চত্বরের জাদুঘর অবশ্যই দেখবেন। এখানে কালো পাথর ও বেলেপাথরের ভাস্কর্য, টেরাকোটা ফলক, প্রাচীন মুদ্রাসহ খননে পাওয়া নানা নিদর্শন সাজানো। মনে রাখবেন, জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ এবং সিসি ক্যামেরায় নজরদারি করা হয়। জাদুঘরের বাইরের সাজানো বাগানেও কিছু সময় কাটাতে পারেন।

বিহার চত্বর বেশ গোছানো। ভেতরে পিকনিকের জায়গা, ছায়াঘেরা বসার স্থান আর পরিষ্কার শৌচাগারের ব্যবস্থা আছে। চত্বরের বাইরে মসজিদও আছে, নামাজের সময় হলে সেখানে যাওয়া যায়। স্যুভেনির ও হালকা খাবারের দোকান চত্বরের বাইরের গেটের কাছে, ভেতরে কোনো দোকান নেই বলে আগেই পানি ও শুকনো খাবার কিনে ঢুকুন।

হাতে সময় থাকলে আশপাশের সত্যপীর ভিটাসহ অন্যান্য ঢিবি ঘুরে দেখুন। পাহাড়পুর এলাকায় আরও কয়েকটি প্রত্নস্থল আছে, স্থানীয় গাইড নিলে সেগুলোর গল্প শুনতে পারবেন।

কীভাবে যাবেন

বাসে: ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে নওগাঁ বা জয়পুরহাট আসতে হবে। ঢাকা থেকে নওগাঁ ও জয়পুরহাট রুটে নিয়মিত বাস চলে, ভাড়া প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। নওগাঁ শহর, জয়পুরহাট বা সান্তাহার থেকে সিএনজি, বাস বা অটোরিকশায় সরাসরি পাহাড়পুর যাওয়া যায়।

ঢাকার গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে উত্তরবঙ্গগামী বাসে উঠুন। রাতের বাসে গেলে ভোরে নওগাঁ বা সান্তাহার পৌঁছে সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যার বাসে ফেরা সম্ভব, তবে এতে বেশ ধকল যায়। আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য এক রাত থাকার পরিকল্পনাই ভালো। বাসের টিকিট অগ্রিম কেটে রাখুন, ছুটির দিনে আসন পাওয়া কঠিন হয়।

ট্রেনে: ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনে সান্তাহার জংশন বা জয়পুরহাট নেমে সেখান থেকে সিএনজি বা অটোতে পাহাড়পুর যাওয়া সুবিধাজনক। ট্রেনে গেলে আগাম টিকিট কেটে রাখুন, বিশেষ করে ছুটির দিনে। লঞ্চে পাহাড়পুর যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই।

স্থানীয় যাতায়াত: সান্তাহার বা নওগাঁ থেকে পাহাড়পুরের দূরত্ব কম, সিএনজি রিজার্ভ করে গেলে সময় বাঁচে। দল বেঁধে গেলে ভাড়া ভাগ করে নেওয়া যায়।

খরচের ধারণা

পাহাড়পুর ভ্রমণে প্রধান খরচ ঢাকা থেকে যাতায়াত। বাসে যাওয়া আসায় প্রায় ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা লাগে। বিহারে প্রবেশ টিকিট ২০ টাকা, জাদুঘরের টিকিটও ২০ টাকা। স্থানীয় সিএনজি বা অটো ভাড়া গন্তব্য ভেদে ৫০ থেকে ২০০ টাকা। খাওয়া ও এক রাত থাকা মিলিয়ে দুই দিনের ট্যুরে জনপ্রতি প্রায় ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা বাজেট রাখুন। ভাড়া ও টিকিটের মূল্য পরিবর্তন হতে পারে, ভ্রমণের আগে যাচাই করে নিন।

কোথায় থাকবেন

পাহাড়পুরে থাকার ব্যবস্থা সীমিত, তাই বেশিরভাগ ভ্রমণকারী নওগাঁ শহরে রাত কাটান। নওগাঁ শহরে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল আছে। জয়পুরহাট শহরেও থাকার অপশন আছে, সেখান থেকে পাহাড়পুরের দূরত্বও কম। একদিনে ঘুরে ফেরার পরিকল্পনা থাকলে ভোরে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় ফেরা যায়, তবে তাড়াহুড়ো না করে এক রাত থাকাই ভালো।

নওগাঁ শহরের হোটেলগুলোতে এসি ও নন এসি দুই ধরনের রুমই পাওয়া যায়, দাম মান ভেদে ভিন্ন। দল বেঁধে গেলে বড় রুম ভাগ করে নিলে খরচ কমে। হোটেল বুকিংয়ের সময় গরম পানি, ওয়াইফাই আর সকালের নাস্তার ব্যবস্থা আছে কিনা জেনে নিন। শীত মৌসুমে পর্যটকের চাপ বেশি থাকে, তাই আগে থেকে বুকিং করে যাওয়া নিরাপদ।

কী খাবেন

নওগাঁ শহরের হোটেলগুলোতে ভাত, মাছ, মাংসসহ সাধারণ বাঙালি খাবার পাবেন। পাহাড়পুর যাওয়ার পথে বগুড়া পড়লে সেখানকার বিখ্যাত দইয়ের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। বিহার চত্বরের বাইরে ছোট খাবারের দোকানে চা, সিঙ্গারা পাওয়া যায়। সঙ্গে শুকনো খাবার ও পর্যাপ্ত পানি রাখুন, কারণ চত্বরের ভেতরে দোকান নেই।

শীতকালে গেলে নওগাঁর বাজারে মৌসুমি শাকসবজি আর খেজুরের রস দিয়ে তৈরি পিঠার স্বাদ নিতে পারেন। সময় থাকলে স্থানীয় বাজারে একবার ঘুরে আসুন, গ্রামের হাটের আসল আমেজ পাবেন।

যাওয়ার সেরা সময়

পাহাড়পুর যাওয়ার সেরা সময় শীতকাল, অক্টোবর থেকে মার্চ। এই সময় খোলা প্রত্নস্থলে হাঁটতে আরাম লাগে, আকাশ পরিষ্কার থাকে। শেষ বিকেলে লাল ইটের গায়ে পড়া সোনালি রোদে মন্দিরের ছবি তোলার সেরা মুহূর্ত। বর্ষায় চত্বর কর্দমাক্ত হতে পারে, আর গ্রীষ্মের দুপুরে খোলা জায়গায় ঘোরা কষ্টকর।

বর্ষার ঠিক পরের শরৎকালেও যাওয়া যায়, তখন চারপাশ সবুজে ভরে থাকে আর আকাশে সাদা মেঘের ভেলা দেখা যায়। তবে ভোরের কুয়াশায় দূরের দৃশ্য ঝাপসা থাকতে পারে, ছবি তোলার পরিকল্পনা থাকলে বেলা বাড়ার পর যান।

টিপস ও সতর্কতা

জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষেধ, নিয়ম ভাঙলে জরিমানা হতে পারে। কেন্দ্রীয় মন্দিরের চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করবেন না, এতে স্থাপনার ক্ষতি হয় এবং বিপদও আছে। সঙ্গে ছাতা বা টুপি, সানগ্লাস আর পানি রাখুন। টেরাকোটা ফলকে হাত দেবেন না, ঘাম ও স্পর্শে প্রাচীন শিল্পকর্ম নষ্ট হয়। সোমবার অর্ধদিবস আর রবিবার পূর্ণদিবস বন্ধ থাকে, সেভাবে পরিকল্পনা করুন। স্থানীয় গাইড নিলে ইতিহাসটা আরও প্রাণবন্ত শোনায়।

গাইড নেওয়ার সময় ফি আগেই ঠিক করে নিন আর কতক্ষণ ঘোরাবেন তা স্পষ্ট করুন। ভোরে বা শেষ বিকেলে মন্দিরের ছবি সবচেয়ে ভালো আসে, দুপুরের কড়া রোদে লাল ইটের আসল রং ধরা পড়ে না। প্যানোরামা মোডে পুরো চত্বরের ছবি তুললে বিহারের বিশালতা বোঝা যায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন: পাহাড়পুর কেন বিখ্যাত? উত্তর: এটি হিমালয়ের দক্ষিণে সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার এবং ১৯৮৫ সাল থেকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য। পাল রাজা ধর্মপাল অষ্টম শতকে এটি প্রতিষ্ঠা করেন, একসময় এখানে নালন্দার মতোই জ্ঞানচর্চা হতো।

প্রশ্ন: প্রবেশ টিকিট কত? উত্তর: বিহারে প্রবেশ টিকিট ২০ টাকা, জাদুঘরের টিকিটও ২০ টাকা। বিদেশিদের জন্য ফি আলাদা। ভ্রমণের আগে হালনাগাদ মূল্য যাচাই করে নিন।

প্রশ্ন: জাদুঘরে কি ছবি তোলা যায়? উত্তর: না, পাহাড়পুর জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ এবং সিসি ক্যামেরায় নজরদারি করা হয়। তবে বিহার চত্বরের বাইরে ছবি তুলতে কোনো বাধা নেই।

প্রশ্ন: একদিনে ঘুরে আসা যাবে? উত্তর: নওগাঁ বা জয়পুরহাট থেকে একদিনেই ঘুরে আসা যায়। তবে ঢাকা থেকে গেলে এক রাত থাকার পরিকল্পনা করাই ভালো, তাতে তাড়াহুড়ো ছাড়া পুরো চত্বর দেখা যায়।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার