বিনোদন ঝলক
তারকা

অমিতাভের সঙ্গে বৃষ্টিভেজা সেই গানে অস্বস্তিতে ছিলেন স্মিতা

বিনোদন ঝলক ডেস্ক১৮ অক্টোবর ২০২৬3 মিনিটে পড়ুন
অমিতাভের সঙ্গে বৃষ্টিভেজা সেই গানে অস্বস্তিতে ছিলেন স্মিতা

১৭ অক্টোবর ছিল স্মিতা পাতিলের জন্মদিন। মাত্র এক দশকের কর্মজীবনে ভারতীয় সিনেমায় অমলিন ছাপ রাখা এই অভিনেত্রীর জন্ম ১৯৫৫ সালের ১৭ অক্টোবর, ভারতের পুনেতে। এ উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক তাঁর অভিনয়জীবনের কিছু অজানা অধ্যায়, যার মধ্যে আছে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর শুটিংয়ের স্মৃতিও।

বাবা শিবাজিরাও গিরধর পাতিল ছিলেন রাজনীতিবিদ, মা বিদ্যাতাই পাতিল ছিলেন সমাজসেবী। দুজনের ব্যক্তিত্বের প্রভাব পড়েছিল স্মিতার বেড়ে ওঠায় ও মানসিকতায়। পুনে ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের প্রাক্তনী স্মিতা সত্তরের দশকে ক্যারিয়ার শুরু করেন মুম্বাই দূরদর্শনের সংবাদপাঠিকা হিসেবে। পরিচালক শ্যাম বেনেগালের হাত ধরে পা রাখেন সিনেমায়। নায়িকা হতে হলে গায়ের রং ফর্সা হতেই হবে, এমন প্রতিষ্ঠিত ধারণাকেও তিনি ভেঙে দিয়েছিলেন।

তাঁর প্রথম ছবি 'মেরে সাথ চল' মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। এর পরের বছর শ্যাম বেনেগালের পরিচালনায় 'নিশান্ত'। এরপর 'চরণদাস চোর', 'মন্থন', 'ভূমিকা' থেকে 'আক্রোশ', 'চক্র', 'সদগতি', 'অর্থ', 'দেবশিশু', 'চিদম্বরম', 'গুলামি', 'বাজার', 'আকালের সন্ধানে', 'মান্ডি', 'অর্ধসত্য', 'মির্চ মাশালা', একের পর এক মাইলফলক ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। শৈল্পিকধারার ছবির পাশাপাশি বাণিজ্যিক ছবিতেও ছিলেন সমান সাবলীল।

দূরদর্শনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মূলধারার ছবিতে নারীচরিত্র নিয়ে নিজের স্পষ্ট মত দিয়েছিলেন স্মিতা। বলেছিলেন, মূলধারার ছবিতে নারীচরিত্রগুলো হয় দুর্বল, বশ্য বা কষ্টভোগী; না হলে খল চরিত্র। তিনি নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করতেন, কারণ এমন নারীচরিত্রে কাজ করেছেন যেখানে তাঁদের আসল সত্তা দেখানো হয়েছে, যাঁরা কেবল ভুক্তভোগী নন।

অভিনয়ের মতো ব্যক্তিজীবনেও স্মিতা ছিলেন স্পষ্টবাদী। একবার একটি দৃশ্যের সংলাপ তাঁর কাছে বাজে ও ক্লিশে মনে হওয়ায় তিনি তা বলতে অস্বীকৃতি জানান। দীর্ঘ আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত সংলাপ বদলে দেওয়া হয়। এত বড় পরিচালক বা সহ অভিনেতার সামনেও নিজের অবস্থান থেকে একচুল নড়েননি তিনি। বিবাহিত রাজ বব্বরের সঙ্গে সম্পর্কও কখনো আড়াল করেননি।

যশ চোপড়ার মতো পরিচালকের কাছ থেকেও পেয়েছিলেন অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতা। একটি প্রকল্পে শুটিং শুরুর একদিন আগে স্মিতাকে বাদ দেন যশ চোপড়া, তাঁকে নিজে কিছু না জানিয়ে। খবরটি পৌঁছে দিতে পাঠানো হয়েছিল শশী কাপুরকে। পরে মুখোমুখি হলে স্মিতা বলেছিলেন, যশজি নিশ্চয়ই ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কিন্তু নিজে জানালে তিনি কষ্ট পেতেন না; শশী এসে বলায় সেটাই তাঁকে আঘাত দিয়েছে। যশ চোপড়া লজ্জিত স্বরে স্বীকার করেছিলেন, স্মিতা ঠিকই বলেছেন, এটা তাঁর ভুল ছিল।

অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও স্মিতার জন্য সহজ ছিল না। 'নমক হালাল' ছবিতে তিনি ছিলেন নায়কের প্রেমিকার চরিত্রে, একেবারে তথাকথিত 'নায়িকা'র ভূমিকায়। ছবির বিখ্যাত বৃষ্টির গান 'আজ রাপাত যায়ে তো' এর শুটিং করতে গিয়ে তিনি ভীষণ অস্বস্তি বোধ করেছিলেন। বছর কয়েক পর অমিতাভ নিজেই তাঁর ব্লগে লিখেছিলেন, পুরো ছবির শুটিংজুড়েই স্মিতা অস্বস্তিতে ছিলেন। কারণ তাঁকে যা করতে বলা হচ্ছিল, সেটা তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

২০১৫ সালে স্মিতা পাতিলকে নিয়ে একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে অমিতাভ স্মৃতিচারণা করে বলেছিলেন, 'ও বলেছিল, এই গানটা তার সংস্কৃতি ও চিন্তার বাইরে। একেবারেই তার স্বভাববিরুদ্ধ। একবার এয়ারপোর্টে কেউ ওকে নমক হালালের জন্য চিনে ফেললে সে নাকি লজ্জা পেত। অথচ ও এত ভালো ভালো ছবিতে কাজ করেছিল।'

রাজ স্মিতার একমাত্র সন্তান প্রতীকের জন্ম হয় ১৯৮৬ সালের ২৮ নভেম্বর। সন্তান জন্মের পর থেকে শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন স্মিতা। ১৩ ডিসেম্বর জ্বর আসে, এতটাই যে শিশুকে কোলে নেওয়ার শক্তিও ছিল না তাঁর। সন্ধ্যার পর হঠাৎ খিঁচুনি ওঠে, শুরু হয় রক্তবমি। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি কোমায় চলে যান। মাত্র দুই সপ্তাহ বয়সী সন্তানকে রেখে ১৯৮৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর মাত্র ৩১ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যান স্মিতা পাতিল।

মাত্র এক দশকের কর্মজীবনে ভারতীয় সিনেমায় তিনি রেখেছেন অমলিন ছাপ। খুব অল্প বয়সে জীবন থেমে গেলেও তাঁর অভিনয়, অবস্থান আর আত্মসম্মানের দৃষ্টান্ত আজও অনন্য। সমান্তরাল ধারার সিনেমার নীরব বিপ্লবী এই অভিনেত্রী দেখিয়ে গেছেন, একজন নারীর 'না' বলার সাহসই হতে পারে তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী সংলাপ।

সূত্র

ফেসবুকে শেয়ার এক্সে শেয়ার হোয়াটসঅ্যাপে শেয়ার